খেলা – Done

আমার সেই দূর শৈশবের দিনগুলোতে সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল রাস্তায় রাস্তায় একটা চাকার পিছনে দৌড়ানো। নিজের চাকা ছিল না। বন্ধুরা কেউ দিত। তারা কোথা থেকে চাকাগুলো পেত, জানি না। পরনের জামাপ্যান্ট কি পাঠ-পঠনের হিসাবনিকাশে আমরা সবাই হয়ত এক গ্রহবাসী ছিলাম না। কিন্তু, দিনের খন্ড অংশের যূথচারী জীবনে আমরা অবশ্যই একই গোষ্ঠীর সন্তান ছিলাম। তাই আমাদের সব সম্পত্তির উপর সবারই কিছু না কিছু অধিকার থাকত। আর, আমার থেকে বছর খানেকের ছোট, আমার মেজ ভাই যে কারো সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলতে অতীব দক্ষ ছিল। সে ছিল আমার সমস্ত কাজের সঙ্গী। তাই চাকা আমার জুটে যেত।

বড় চাকা হিসেবে ব্যবহার হত বাইসাইকেলের চাকার টায়ার। একটা ছোট কাঠি দিয়ে ক্রমাগত সেটাকে ছোট ছোট পিটুনি দিতে দিতে সেটার পাশে পাশে দৌড়াতে থাকা। কখনো একা, কখনো দল বেঁধে, এক চক্কর বা কয়েক। বড় চাকা নিয়ে এই দৌড়টা একটু কম মর্যাদার খেলা ছিল। বড় মর্যাদার খেলা ছিল – ছোট চাকা নিয়ে দৌড়। সম্ভবতঃ সাত-আট ইঞ্চি ব্যাসের ধাতব চাকা, ইঞ্চির আটভাগের এক ভাগ বা তার কাছাকাছি পুরু – নিরেট, একেবারে মাঝখানে একটু ফাঁকা। একটা ধাতব কাঠির এক মাথা বাঁকিয়ে একটা ছোট ইংরেজী ইউ বানিয়ে সেই ইউ-এর ভিতরটায় ঠেকনা দিয়ে চাকাটা দাঁড় করিয়ে তারপর চাকাটা ঠেলে ঘোরাতে ঘোরাতে তার পিছন পিছন দৌড়নো। খুব দক্ষরা মাঝে মাঝে ইউটা চাকার মাঝখানে রেখেও দৌড়াতে পারত।

অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর সবাই মিলে জিরোতে বসতাম – মাঠে, কারো বাড়ির রোয়াকে বা পুকুরপারের বাঁধানো ঘাটে। অন্ধকার নেমে এসেছে। এই সময় ধাতব কাঠিটা দিয়ে ধাতব নিরেট চাকাটার গায়ে একটু জোরে মারলে ঠং করে আওয়াজের সাথে আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠত, কখনো কখনো একটা হাল্কা পোড়া গন্ধ। বড় হতে হতে চাকা-দৌড়ানোর এই খেলাটা হারিয়ে গেল। নাঃ ভুল হল! এই খেলাটাই জীবন হয়ে গেল – নানা রকমের চাকার সাথে বা পিছনে দৌড়ে চলা।

চাকা নিয়ে দৌড়ানোর খেলা ছাড়া অন্যান্য ছুটোছুটির খেলায় আমার সেই সময় তেমন আগ্রহ ছিলনা। লুকোচুরি, ডাংগুলি, পিট্টু – খেলতাম এসব, অল্প। আসলে বাবার কড়া শাসনে বাইরের সময়টা খুব সংক্ষিপ্ত ছিল। ঘরের খেলায় বেশী সময় কাটত। বারোটা ঘনকের একটা পাজ্‌ল-গেম ছিল – পাশ পাল্টে পাল্টে ছটা ছবি তৈরী করা যেত। অজস্রবার খেলেও ওটা আমার কখনো পুরনো হত না।

আর একটা ছিল স্থাপত্য বিদ্যার খেলা। অনেকগুলো আয়তঘন, কয়েকটা ঘনক, কিছু কৌণিক, অর্ধগোলক, আর কয়েকটা গোলাকৃতি খিলান নিয়ে বেশ জমজমাট একটা বাক্স। সাথে কয়েকটা ছবি যেগুলো দেখে দেখে বাড়ি, দরজা আরো কি কি সব যেন বানাতে হত। বানাতাম বেশীটাই যদিও – যেমন মন চায়। ভারসাম্য রেখে টুকরোগুলোকে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রায়ই ইচ্ছের সাথে বাদ সাধত।

তবে এই খেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনার ছিল এক যন্ত্রবিদ্যার খেলনা। সেটার নামও বোধ হয় ছিল মেকানিক্স বা ঐরকম কিছু। দুই থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা অনেকগুলো ধাতব পাত ছিল। ধারগুলো গোল, যাতে ধরবার সময় কেটেকুটে না যায়। পাতগুলোতে ফুটোর সারি। সাথে নানা আকৃতির টুকরো – এল আকৃতির, এক্স আকৃতির, ত্রিভুজ, গোল, পিঠ আর বসার জায়গা জুড়ে চেয়ার, মেঝে আর দেয়াল একসাথে ধরবার জন্য জোড়াপাত। সবার গায়ে সুসমঞ্জস ফুটোর সারি। আর, অনেকগুলো নাট, বল্টু, ওয়াশার। সেগুলো লাগাবার জন্য রেঞ্চ, স্ক্রু-ড্রাইভার, সুতো, কাঁচি – এলাহি ব্যাপার। বেঞ্চ, দোলনা, ঢেঁকি, সেতু, গাড়ি, বাতিস্তম্ভ – কত কি যে বানানো যেত!

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বাবার বোধ হয় ইচ্ছে ছিল ছেলে ঘর-বাড়ি-সেতু বানানোর বিশারদ হবে। হল না। প্রিয় খেলনার টুকরোগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। আর আমিও যত দিন গেল, যন্ত্রবিদ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে গেলাম। অনেক পরে অবশ্য জীবন যাপনের এক পর্যায়ে জৈব অণুর কাটাকুটি আর জোড়া লাগানোকে ইঞ্জিনিয়ারিং বলায় চাপা কোন আনন্দ পেয়েছিলাম। শৈশবের দিনগুলোর স্মৃতি তখন হয়ত ভিতরে কোথাও একটু সুর তুলে বেজে গিয়েছিল।

আমার প্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে একটা ছিল প্যারাস্যুট ছোঁড়ার খেলা। পাতলা হাল্কা প্লাস্টিকের একটা চৌকো টুকরোর চারকোণায় চারটে সুতো বাঁধা হত। সুতোগুলোর অন্যপ্রান্ত একসঙ্গে করে গিঁট বেঁধে সে প্রান্তে একটা ছোট ঢিল ভাল করে বেঁধে দেওয়া হত। হয়ে গেল প্যারাস্যুট। এটাকে ঠিকমত উপরে ছুঁড়ে দিলে নামার সময় প্লাস্টিকটা ফুলে ছাতার মত হয়ে যেত। হেলে দুলে নেমে আসত প্যারাস্যুট। ঢিলের ওজন কম হলে প্যারাস্যুট হাওয়ায় ভেসে যেত। ওজন বেশী হলে প্যারাস্যুট ঠিকমত খুলতে পারার আগেই হু হু করে নেমে আসত সেটা। প্লাস্টিক জড়িয়ে গিয়েও কখনো কখনো গণ্ডগোল হয়ে যেত – প্যারাস্যুট খুলত না তখন। হয়ে যেত স্রেফ একটা ঢিল। কারো উপরে পড়লে ঘটনা-শিকলের শেষপ্রান্ত আমার পিঠে। বড় সাবধানে খেলতে হত তাই।

আর একটা খেলা ছিল খেজুরকাঁটার। সেটার ভোঁতা দিকে একটু চিরে সেখানে কার্ডবোর্ডের ছোট দুটো টুকরো গোঁজা হত। টুকরো দুটো প্রান্ত মিলিয়ে ভাঁজ করে একটা গুণচিহ্ন বা যোগচিহ্ন বানানো হত। কার্ডবোর্ডের টুকরো আসত বড়দের ফেলে দেওয়া বাক্স থেকে। এইটিরও চল প্যারাস্যুটের-ই মত ছিল। কাঁটার মাঝখানে ধরে উপরদিকে ছুঁড়ে দেয়া হত। ঠিকমতো ছোঁড়া হলে কাঁটা নিজের দৈর্ঘ্য বরাবর অক্ষের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে নেমে এসে ছুঁচলো মুখ মাটিতে গেঁথে দাঁড়িয়ে যেত। কত যে কাঁটার খোঁচাখুঁচি খেয়েছি। কিন্তু সেটা বাবাকে জানতে দেওয়া চলত না। কাঁটার খোঁচার থেকে বাবার হাতের থাপ্পড় কি কানমলা বেশি বেদনার ছিল। শরীরের নিগ্রহের সাথে অপমানের জ্বালা জুড়ে যেত।

উপরের দিকে ছুঁড়ে দেয়ার আরও একটা খেলা ছিল। আট থেকে বারো ইঞ্চি লম্বা, আধা থেকে এক ইঞ্চি চওড়া একটু ওজনদার একটা বাঁশের বাখারির টুকরো। তার এক মুখ ভোঁতা অন্য মুখ ছুঁচলো। ভোঁতা দিকে ধরে এমন ভাবে উপরের দিকে ছুঁড়ে দেয়া হত যে বাখারিটা ছুঁচলো মুখ নীচের দিকে করে নেমে এসে মাটিতে গেঁথে যেত। এক্ষেত্রেও গেঁথে গিয়ে বাখারিকে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে হত। এই খেলাটায় আমার বেশ দক্ষতা এসেছিল। তাতেই হয়ত সতর্কতা কমে গিয়েছিল। এক বিকালে বাখারিটা নেমে এসে চমৎকার ভাবে গেঁথে গেল – মাটিতে নয়, আমার ডান পায়ের কড়ে আঙ্গুল আর তার পাশের আঙ্গুলের মাঝের খাঁজে। বাখারি টেনে বার করার সাথে সাথেই তোড়ে বেরিয়ে এল লাল স্রোত। এবারে অবশ্য আর বাড়িতে মার খেতে হয়নি। আমার চোট সামলাতেই বাবার অবস্থা কাহিল হয়ে গিয়েছিল। তবে খেলাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরোপুরি।

সেই সময় ভারতে স্বাধীনতা আসার যুগটির কিছু অবশেষ এদিক ওদিকে পাওয়া যেত। যেমন – মাঝখানে বড় ফুটোওয়ালা চাকতির পয়সা। ফুটো পয়সা। প্রায় সমস্ত হামা দেওয়া বাচ্চাদের কোমরে দেখতাম – শক্ত সুতো, আমরা বলতাম কার, দিয়ে একটা ফুটো পয়সা বাঁধা আছে। সময়ের পথ ধরে এই ফুটো পয়সার মত বাতিল হওয়া আর এক বিনিময়-মাধ্যম ছিল কড়ি। এখন অনেকে গয়নায় পড়েন। আচার-অনুষ্ঠানেও ব্যবহার হয় – আধ থেকে দেড় কড় মাপের ছোট সামুদ্রিক শামুকের খোলা। চকচকে, সুদৃশ্য, চ্যাপ্টা-পেট ডিমের মত, পেটের দিকটা মাঝবরাবর লম্বালম্বি খাঁজ কাটা। চ্যাপ্টা হওয়ায় ঐ দিকটা দিয়ে বসালে কড়িটা সুস্থির থাকে।

মা-ঠাকুমার সাথে বসে কড়ি খেলতাম। আরো মেয়েরাও জুটে যেত। কয়েকটা কড়ি মুঠো খুলে উপরে ছুড়ে দিয়ে মাটিতে পড়ার আগে মাটি থেকে একটু উপরে সোজা বা উল্টো করে মেলা হাতের পাতায় তাদের ধরে রাখা, পড়তে না দেয়া। অথবা মুঠো করে মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে একটা কড়িকে দিয়ে আঙ্গুলের টিপে আর একটা কড়িকে টোকা লাগানো। বড় হয়ে যে বিদ্যেকে ক্যারম খেলায় বড় মাপে পেয়েছি।

এখন এই কড়িগুলো বড়দের কাছে যত সুলভ হোক, ছোটদের কাছে তাদের পরিমাণ সীমিত ছিল। তাই ঠাকুমা কড়ির এক বিকল্প শিখিয়ে ছিল আমাদের। অন্য বাড়িতে কি হত জানিনা, আমাদের বাড়িতে কাঁঠালের বীচি শুকিয়ে রেখে দেয়া হত – সারা বছর ধরে বাহারি খাদ্য হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য। মা-ঠাকুমার অনুমতি নিয়ে কিছু কাঁঠালের বীচি জাঁতি দিয়ে দু’রকম ভাবে অর্ধেক করে আমরা ছোটরা ব্যবহার করতাম দু রকমের বিকল্প খেলনার জন্য। লাট্টু আর কড়ি।

প্রথমটার জন্য দুই মেরুপ্রদেশ অক্ষুণ্ণ রেখে বিষুবরেখা বরাবর কেটে ফেলতাম। তারপর বিছানা ঝাড়ার জন্য নারকেল শলার যে পরিষ্কার ঝাঁটাটা ব্যবহার হত সেইটার একটা শলা ভেঙ্গে বের করে নিতাম দুটো ছোট টুকরো। দুই শলার টুকরোকে কর্তিত কাঁঠাল বীচির দুই টুকরোর নরম চ্যাপ্টা দিকটার ঠিক মাঝখানটায় অর্ধেকমত গেঁথে দিলেই হয়ে গেল দুটো লাট্টু। এবার মেরু বিন্দুতে ভর করিয়ে, দুই আঙ্গুলে শলা ধরে দাও পাক মেরে। ঘুরতে থাকুক কাঁঠাল বীচির লাট্টু।

কড়ির বিকল্প বানানো আরো সহজ ছিল। ঠিক মাপের কাঁঠাল বীচির দুই মেরুর মধ্য দিয়ে দ্রাঘিমা বরাবর অর্ধেক করলেই পাওয়া গেল দুইখানি বিকল্প কড়ি। খেলতে থাকো এবার যত খুশী। কড়ি হারিয়ে ফেলার দুশ্চিন্তা আর রইলনা। বড় হয়ে দেখলাম – বিশ্বজোড়া খেলাঘরে বিকল্পর ছড়াছড়ি।

আরও নানা রকম খেলার স্মৃতি – অন্য কোন পর্বে, অন্য কোন দিন, সেই সব খেলার কিছু কিছু হয়ত এখন আর কোথাও কেউ খেলে না, খেলবে না।

আমার সেই দূর শৈশবের দিনগুলোতে সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল রাস্তায় রাস্তায় একটা চাকার পিছনে দৌড়ানো। নিজের চাকা ছিল না। বন্ধুরা কেউ দিত। তারা কোথা থেকে চাকাগুলো পেত, জানি না। পরনের জামাপ্যান্ট কি পাঠ-পঠনের হিসাবনিকাশে আমরা সবাই হয়ত এক গ্রহবাসী ছিলাম না। কিন্তু, দিনের খন্ড অংশের যূথচারী জীবনে আমরা অবশ্যই একই গোষ্ঠীর সন্তান ছিলাম। তাই আমাদের…