ঈশপের গল্প (১১৬ – ১২০)

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে রচিত ভিনদেশী এই গল্পগুলি স্থান-কালের সীমানা পেরিয়ে আজো আমাদের চেনা জগতের কথা বলে যায়।

****************************************
বারে বারে পড়ার মত গল্পগুলিকে একালের বাংলা ভাষায় আমার নিজের মত করে ধরে রাখার ইচ্ছের ফসল এই লেখা।
অনুবাদ ইংরেজী পাঠের অনুসারী, আক্ষরিক নয়। সাথে আমার দু-এক কথা।
গল্পসূত্রঃ R. Worthington (DUKE Classics)-এর বই এবং আন্তর্জাল-এ লভ্য http://www.aesop-fable.com -এ ইংরেজী অনুবাদের ঈশপের গল্পগুলি।
গল্পক্রমঃ R. Worthington-এর বইয়ে যেমন আছে।
****************************************

(১১৬)
The Boar and the Ass

শূয়োর আর গাধার গল্প

একবার এক পাজী গাধার সাথে এক শুয়োর-এর দেখা হয়েছে। গাধাটার ঝোঁক চাপল শুয়োর-টার সাথে ফাজলামি করার। সে শুয়োরের কাছে গিয়ে খুব বিনয় দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বান্দা হাজির, বলেন আপনার জন্য কি করতে পারি।” শুয়োর ত এ গাধাকে চেনে। খুব বিরক্ত হল সে। গাধাটার দিকে তেড়ে গিয়ে জানতে চাইল যে, এই রকম ফালতু কথা বলার কি এমন অসভ্যতা করার স্পর্ধা তার হয় কি করে! রাগের চোটে তার ইচ্ছে হচ্ছিল এক্ষুণি গাধাটার পেটখানা ফাঁসিয়ে দ্যায়। শেষ মুহুর্তে মাথা ঠাণ্ডা করে সেই প্রবল ইচ্ছেটা সামলে নিয়ে সে বলল, “ভাগ এখান থেকে, হতভাগা জানোয়ার! তোর মত একটা হতচ্ছাড়ার রক্তে দাঁত ভেজানোর কোন ইচ্ছে নেই আমার।”

প্রাচীন বচনঃ নিজের থেকে ছোটদের সাথে ঝগড়া করা বড়দের শোভা পায়না।

আমি বলিঃ যত বিনয়ের সাথেই কথা বলুক, সাধারণ লোকেদের কোন কথাই ক্ষমতাবানদের সহ্য হয় না।

(১১৭)
The Fox and the Goat

শেয়াল আর ছাগল

একদিন এক শেয়াল একটা কূয়োর মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও সে সেই কূয়োটা থেকে উঠে আসতে পারেনি। এদিকে একটা ছাগলের সেই সময় খুব তেষ্টা পেয়েছে। সে ঘুরতে ঘুরতে কূয়োর পাশে এসে হাজির। কূয়োর মধ্যে শেয়ালকে দেখে সে জানতে চাইল যে ঐ কূয়োর জল খাওয়ার মত কি না। শেয়াল তখন নিজের দুরবস্থা চেপে গিয়ে এক গাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে নানাভাবে সেই জলের প্রচুর সুখ্যাতি করল। বলল ঐ জল এত ভালো যে তা কল্পনারও অতীত। খুব করে ছাগলকে সে উৎসাহ দিল নীচে নেমে এসে জল পান করে যাওয়ার জন্য।

ছাগল ত তেষ্টার চোটে কোন কিছু খেয়াল না করে কূয়োর ভিতর লাফিয়ে পড়ল। সবে তার তেষ্টা মিটেছে, শেয়াল এবার তাকে জানাল কোন ভয়ানক অবস্থায় তারা আটকা পড়েছে। এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছাগলের কাছে সে একটা প্রস্তাব রাখল। বলল, “তুমি যদি তোমার সামনের পা দুটো তুলে কূয়োর দেয়ালে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াও আর তোমার মাথাটা নিচু করে রাখ, আমি তা হ’লে তোমার পিঠের উপর দিয়ে দৌড়ে কূয়োর বাইরে চলে যাব। আমি একবার বের হতে পারলে তোমাকেও তখন উদ্ধার পেতে সাহায্য করতে পারব।” ছাগল ত সঙ্গে সঙ্গে শেয়ালের প্রস্তাবমত দাঁড়িয়ে গেল। শেয়াল লাফ দিয়ে ছাগলের পিঠে চড়ল। তার শিং ধরে নিজেকে সোজা করল। তারপর নিরাপদে কূয়োর বাইরে এসেই একটুও দেরী না করে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য দৌড় লাগাল।

ছাগল যখন এতে তাকে শর্তভঙ্গের জন্য অভিযুক্ত করল, শেয়াল ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল “ওরে বুদ্ধু! তোর দাড়িতে যত চুল, তোর মাথায় যদি সেই অনুপাতে বুদ্ধি থাকত তা হলে উপরে ওঠার পথ ঠিক না করে তুই নীচে ঝাঁপিয়ে পড়তি না। যেই বিপদ থেকে রেহাই পাওয়ার কোন উপায় তোর জানা নেই, সেই বিপদের দিকে নিজেই নিজেকে এইভাবে ঠেলে দিতিস না।”

প্রাচীন বচনঃ দেখেশুনে লাফ দিও।

আমি বলিঃ শয়তানের চরিত্র জানা থাকা সত্ত্বেও যে মূর্খ তাকে বিশ্বাস করে তার ধ্বংস হওয়াটাই স্বাভাবিক।

(১১৮)
The Oxen and the Butchers

এক দল ষাঁড় আর কসাইদের গল্প

কসাইরা ষাঁড় মারে। সে জন্য ষাঁড়েরা অনেকে মিলে একবার ঠিক করল যে তারা সব কসাইদের মেরে ফেলবে। নির্দিষ্ট দিনে তাদের পরিকল্পনা কাজে লাগানোর জন্য সবাই মিলে একটা জায়গায় জড়ো হল। আচ্ছা করে তাদের শিং-এ শান দিল তারা। সবাই তৈরী। এই সময় তাদের মধ্য থেকে একটি ষাঁড়, বেশ বয়স হয়েছে তার, (অনেক জমি চষেছে সে এ পর্যন্ত) বলল, “এটা ঠিক যে, এই কসাইরা আমাদের মেরে ফ্যালে। কিন্তু কাজটা তারা করে খুব ভালোভাবে, কোন অতিরিক্ত যন্ত্রণা না দিয়ে। এখন এই কসাইদের যদি আমরা মেরে ফেলি, তাহলে এর পর যাদের পাল্লায় গিয়ে পড়ব আমরা, তারা ত এই কাজটার কিছুই জানে না। তাদের হাতে আমাদের মৃত্যুযন্ত্রণা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। কসাইদের হয়ত মেরে ফেলাই উচিত। কিন্তু আমি তোমাদের নিশ্চয় করে বলতে পারি, কসাইরা থাকুক আর না থাকুক, মানুষেরা আমাদের মাংস খাওয়া ছেড়ে দেবে না।”

প্রাচীন বচনঃ তাড়াহুড়ো করে এক শয়তানের বদলে আর এক শয়তানকে ডেকে আনার কোন মানে হয় না।

আমি বলিঃ শাসন পদ্ধতি একই থেকে গেলে শাসক যেমনই বদলাক শাসিতের তাতে বড় কোন লাভ হয় না।

(১১৯)
The Horse and the Rider

ঘোড়া আর তার চালক

এক ঘোড়সওয়ার সেপাই তার ঘোড়াটার খুব যত্ন নিত। যুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে সে ঘোড়াটাকে তার সহযোদ্ধার মর্যাদা দিত, অনেক যত্ন করে তাকে খড়-ভুট্টা খেতে দিত। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ঘোড়াটার জন্য সে ভূষি ছাড়া আর সব খাবার বন্ধ করে দিল। আর, তাকে জুতে দিল ভারী ভারী কাঠের বোঝা টানার কাজে। খাটাতে লাগল তাকে ক্রীতদাসের মত।

একদিন কিন্তু আবার যুদ্ধ শুরু হল। সেই সেপাই তখন তার ঘোড়ার পিঠে যুদ্ধের সাজসজ্জা চাপিয়ে তার উপর চড়ে বসল। গায়ে তার বিশাল ভারী কোট, যুদ্ধের চিঠিপত্রের। সমস্ত কিছুর ওজনের চাপে ঘোড়াটা সটান মাটিতে পড়ে গেল। এত ভার তার আর নেয়ার ক্ষমতা নেই। ঘোড়াটা এবার তার মালিককে বলল, “আপনি ত আমাকে আর ঘোড়া রাখেননি, গাধায় নামিয়ে এনেছেন। যান, এবারে আপনি পায়ে হেঁটেই যুদ্ধে যান।”

প্রাচীন বচনঃ যারা একবার দরকার ফুরিয়ে গেলেই বন্ধুদের আর সম্মান দেয়না, পরে দরকারের সময় বন্ধুদের কাছ থেকে তারা আর কোন সাহায্য পায় না।

আমি বলিঃ ক্ষমতাবানের কাছ থেকে কারো আদর ততদিন-ই জোটে যতদিন সে লোকের থেকে ক্ষমতাবানের কোন লাভ হয়।

(১২০)
The Dog and the Hare

কুকুর আর খরগোশ-এর গল্প।

পাহাড়ের ধার দিয়ে দিয়ে এক কুকুর একটি খরগোশ-কে তাড়া করে ছুটছিল। লম্বা ধাওয়ার মাঝে একবার সে এমনভাবে খরগোশের ঘাড় কামড়ে ধরল যেন তাকে মেরেই ফেলবে। আবার আর একবার শুধু একটু আহ্লাদী ঝটাপটি করে ছেড়ে দিল যেন দুই কুকুরের খেলা হচ্ছে। খরগোশটা তখন সেই কুকুরকে বলল, “ভাল হত, আপনার প্রকৃতই যা মতলব, সেই মত কাজ করলে, নিজের আসল রূপটা দেখালে। কখনো ভাব দেখাচ্ছেন যেন আপনি আমার বন্ধু, কিন্তু তাই যদি হবেন তা হলে এমন সাংঘাতিকভাবে আমায় কামড়ে ধরেছিলেন কেন? আবার যদি আমার শত্রুই হবেন, তা হলে আমায় নিয়ে এমন আহ্লাদ করছেন কেন?”

প্রাচীন বচনঃ যাদের সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে তাদের বিশ্বাস করা যাবে কি যাবে না, তাদের বন্ধু বলা যায় না।

আমি বলিঃ শয়তান মাঝে মাঝে আহ্লাদ দেখায়, নিজের শিকারের আনন্দ আরো বাড়াতে। ঐ আহ্লাদে যে হতভাগ্য ভোলে, তার সর্বনাশ আরো নিশ্চিত হয়।