ঈশপের গল্প (১৬ – ২০)

(১৬)
The Wolf and the Sheep

নেকড়ে আর ভেড়ার গল্প

এক নেকড়ের একদিন খুব শরীর খারাপ করেছে, নড়তে-চড়তে পারছে না। ব্সে থাকতে থাকতে একসময় দেখে এক ভেড়া যাচ্ছে সেখান দিয়ে। নেকড়েটা তাকে ডেকে কাছের ঝর্ণা থেকে জল এনে দেওয়ার অনুরোধ জানালো। “জল এনে দিলেই হবে,” ভেড়াটাকে বলল সে, “মাংসের যোগাড়টা আমি নিজেই করে নিতে পারব।” “হ্যাঁ, তার আর সন্দেহ কি,” ভেড়া শুনে বলে, “আমি তোমায় একটি আঁজলা জল এনে দিলেই হবে। তার পরে এই আমাকে দিয়েই মাংস জোগাড় করার কাজটাও তোমার এমনিই হয়ে যাবে।”

প্রাচীন বচনঃ ধোঁকাবাজী কথা সহজেই ধরা পড়ে যায়।

আমি বলিঃ তোমাকে মেরে যার লাভ আছে, সে যখন নিরীহ কথা বলে কাছে ডাকে, নিশ্চিত জেনো সেটা ফাঁদ, একবার বিশ্বাস করেছ কি মরেছ।

(১৭)
The Cock and the Jewel

এক মোরগ আর একটা খুব দামী মণি

এক মোরগ খাবার খুঁজছিল। নিজে খেতে হবে, বাচ্ছাদেরও খাওয়াতে হবে। এখানে ওখানে খোঁজাখুঁজি করতে করতে হঠাৎ তার নজরে আসে বাহারী এক মণি – অত্যন্ত দামী। মণিটা দেখে মোরগ বলল, “ মণি রে, আমার বদলে তোর মালিক যদি তোকে এখন পেত, আদর করে তুলে নিত তোকে, সাজিয়ে রাখত তোকে কত মর্যাদা দিয়ে। কিন্তু আমার কাছে তোর কোন দাম-ই নেই। দুনিয়ার সমস্ত মণি এনে দিলেও আমি বরঞ্চ চাইব একটা শস্যের দানা।”

প্রাচীন বচনঃ একটা অতি দামী জিনিষ ও তার কাছে অর্থহীন যে লোক সেটাকে কোন কাজে লাগাচ্ছে না।

আমি বলিঃ বিশ্বাসে নির্ভর করেই যারা চলবে ঠিক করেছে, যুক্তি-তর্কের মহাজ্ঞানে তাদের কিছু যায়-আসে না।

(১৮)
The Two Pots

দুই কলসীর গল্প

নদীতে ভাসতে ভাসতে চলেছে দুই কলসী। এক কলসী মাটির, এক কলসী পিতলের। স্রোতের টানে ভেসে যেতে যেতে মাটির কলসী পিতলের কলসীকে বলে, “প্রার্থনা করি রে ভাই, দূরে দূরে থাক, আমার দিকে আসিস না তুই। আলতো করেও যদি একবার ছুঁয়ে ফেলিস আমায়, টুকরো টুকরো হয়ে যাব আমি; আর আমার কথা যদি বলিস, তোর ধারে কাছে যাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই আমার।”

প্রাচীন বচনঃ ঠিক ঠিক বন্ধুত্ব হয় শুধু সমানে সমানে।

আমি বলিঃ যে মহাজন সুদ দ্যান, তিনি যত-ই চিকন-চাকন হন, তারে দূরে রাখাই ভাল। তার সাথে ‘তুমিও মালিক, আমিও মালিক’ এই বেরাদরীতে গেলে আখেরে পস্তাতে হবে।

(১৯)
The gnat and the Lion

এক ডাঁশ আর এক সিংহ

এক ডাঁশ এক সিংহের কাছে এসে খুব কষে তড়পাল ঃ “শোন রে সিংহ, আমি তোকে একটুও ভয় পাই না, আর তুই আমার থেকে কিছুই শক্তিশালী নোস। তোর জোরটাই বা কিসে? আঁচড়াতে পারিস নোখ দিয়ে, কামড়াতে পারিস দাঁত দিয়ে – কি এল গেল তাতে? আবার ও বলছি, শুনে রাখ, সব দিক ভেবে দেখলে আমার জোর তোর থেকে অনেক বেশী। কোন সন্দেহ থাকলে, আয়, লড়ে যা, দেখি কে জেতে।” এই বলে, সেই ডাঁশ ভোঁ ভোঁ আওয়াজ করে, ঝাঁপিয়ে পড়ল সিংহের উপরে আর একেবারে তার নাকের ডগায় দিল হুল ফুটিয়ে। সিংহ ডাঁশটাকে থাবার থাবায় মেরে ফেলতে গিয়ে নিজের-ই নখ-এ নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে ভীষণ রকম কাহিল হয়ে পড়ল। ডাঁশ এইভাবে সিংহের সাথে যুদ্ধ জিতে ফেলে গোঁ গোঁ করে বিজয়-সঙ্গীত গাইতে গাইতে উড়ে চলে গেল। কিন্তু বেশীদূর যাওয়া হল না তার, সোজা গিয়ে জড়িয়ে গেল কাছাকাছি এক মাকড়সার জালে। খানিকক্ষণের পরে, চলে গেল মাকড়সার পেটে। মরার সময় ডাঁশটা খুব করে নিজের ভাগ্যকে শাপশাপান্ত করে বলে গেল, “কি দুঃখের কথা, আমি, সিংহের মত একটা মহা শক্তিশালী জন্তুকে যে অনায়াসে হারিয়ে দিয়ে এল, একটা তুচ্ছ মাকড়সাটার কাছে শেষ হয়ে গেলাম।”

প্রাচীন বচনঃ সবচেয়ে কম যাকে ভয় করা যায়, সেই দেখা যায় সবার চেয়ে বেশী ভয়ংকর হয়ে উঠল।

আমি বলিঃ একটা লড়াই জিতলেই যদি কান্ডজ্ঞান লোপ পেয়ে যায়, বাকি লড়াইগুলো আর তা হলে জিততে হবে না।
(টীকাঃ ডাঁশ = মশা জাতীয় পতঙ্গ, হুল ফুটিয়ে অবস্থা কাহিল করে ফেলে)

(২০)
The Widow and her Little Maidens

এক বিধবা আর তার ছোট ছোট দুই কাজের মেয়ে

এক বিধবা মহিলার মহা বাতিক ছিল সবকিছু পরিস্কার করে রাখার। দুটি ছোট ছোট মেয়েকে সে লাগিয়ে নিয়েছিল তার কাজে। খুব খাটাত সে মেয়েগুলোকে। ভোরবেলা মোরগের কোঁকর কোঁ ডাক শোনা গেলেই সে তাদের কাজ করার জন্য ঠেলে তুলে দিত। জেরবার হয়ে গিয়ে মেয়েদুটো একদিন ঠিক করল যে মোরগটাকে শেষ করে দিলেই ওটা আর তাদের মালকিনকে জাগাতে পারবে না। যেমন ভাবা তেমন কাজ – মেরে ফেলল তারা মোরগটাকে। ফল হল এই, এবার তারা আরো মুস্কিলে পড়ে গেল। মোরগের ডাক না শুনতে পাওয়ায় তাদের মালকিন এখন সময়ের আর কোন হিসেব-ই করে উঠতে পারল না। মাঝরাত্তিরেই সে তাদের ঠেলে তুলে দিয়ে কাজ করতে লাগিয়ে দিল।

প্রাচীন বচনঃ অন্যায্য উপায়ে কাজ-এর চাপ কমাতে গেলে ঝামেলা আরো বেরে যায়।

আমি বলিঃ অসহায় যারা তারা পিষ্ট হতে হতে একসময় কোন একটা ভুল করে ফেলবে। ফলে, তখন তারা আরো বেশী করে পিষ্ট হবে। আর, নীতিনির্ধারকেরা তাদের উদাহরণ তুলে ধরে বলবে – দ্যাখো, অন্যায্য কাজ করে আখেরে লাভ হয় না। হায় রে বিচার!

আগের পর্ব পরের পর্ব