ঈশপের গল্প (২৬ – ৩০)

ঈশপের নীতিগল্পগুলি, যত দিন যাচ্ছে, জীবনের চলার পথে আরো বেশী করে অনুভব করছি। সম্প্রতি ইচ্ছে হ’ল সে’গুলি ফিরে পড়ার, ধরে রাখার – নিজের মত করে।

অনুবাদ ইংরেজী পাঠের অনুসারী, আক্ষরিক নয়। সাথে আমার দু-এক কথা।

[গল্পসূত্রঃ R. Worthington (DUKE Classics)-এর বই এবং আন্তর্জাল-এ লভ্য http://www.aesop-fable.com -এ ইংরেজী অনুবাদের ঈশপের গল্পগুলি।
গল্পক্রমঃ R. Worthington-এর বইয়ে যেমন আছে]

(২৬)
The Trumpeter taken Prisoner

বন্দী ভেঁপু-বাজিয়ে

এক ভেঁপু-বাজিয়ে বুক-চিতিয়ে, জোরদার ভেঁপু বাজাতে বাজাতে সেনাদল নিয়ে যাওয়ার সময় শত্রুদের হাতে বন্দী হয়ে গেল। ভেঁপু-বাজিয়ে কেঁদে কেটে প্রাণভিক্ষা চাইলঃ “আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন। আমাকে ছেড়ে না দেওয়ার কোন কারণ নেই, আমি কাউকে আঘাত করিনি। আপনার সৈন্যদের কাউকে খুন করিনি আমি। আমার কাছে কোন অস্ত্র নেই। থাকবার মধ্যে আছে শুধু এই পিতলের ভেঁপুটা।” “ঠিক এই কারণেই তো তোকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া দরকার,” বলল তারা, “তুই নিজে যুদ্ধ না করলে কি হবে, তোর ঐ প্রবল ভেঁপুর বাজনাই তোদের সৈন্যদের যুদ্ধের উৎসাহ দিয়ে গেছে।”

প্রাচীন বচনঃ যে অশান্তি পাকায় আর যে অশান্তি পাকানোয় মদত দ্যায় দুজনেই সমান দোষী।

আমি বলিঃ কোন সংবাদ পত্রিকা, দূরদর্শন বা বেতার চ্যানেল, ব্লগ, গোষ্ঠী, দল বা ব্যক্তি, যে কেউ দাঙ্গায় প্ররোচনা দিলে দাঙ্গা-জনিত খুন বা ধ্বংসের দায়িত্ব দাঙ্গাকারীদের পাশাপাশি তাদের উপরেও বর্তায়।

সতর্কীকরণ ঃ মতামত মাত্রই খুন বা ধ্বংসের প্ররোচনা নয়। উপরে বলা দায়িত্ব সংক্রান্ত কথা কেবল মাত্র প্ররোচনা সম্পর্কে বলা হয়েছে।

(২৭)
The Fatal Marriage

বিয়ে করে প্রাণ গেল

এক ইঁদুর খুব ভাল কাজ করে বনের রাজা সিংহ-র মন জয় করে ফেলল। তবে, সিংহ হচ্ছেন রাজামশায়। মহৎ কাজে বনের অন্য কোন জন্তু তাকে ছাড়িয়ে যাবে এটা তিনি হতে দিতে পারেন না। তাই তিনি অত্যন্ত উদার হয়ে ইঁদুরকে বললেন তার যা মন চায় তাকে জানাতে, তিনি তা মঞ্জুর করে দেবেন। এই বিরাট আশ্বাস পেয়ে ইঁদুরের উচ্চাশা একেবারে আগুনের শিখার মত লকলক করে উঠল। কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক, কতটা রাজামশাইয়ের পক্ষে দেওয়া সম্ভব, কতটা নয়, কোন বিচার-বিবেচনা রইলনা তার। সে দাবী করে বসল, মহারাজের মেয়ে তরুণী সিংহী রাজকুমারীর সাথে তার বিয়ে দিতে হবে। সিংহরাজ তার কথা রাখলেন, রাজকুমারীকে ইঁদুরের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু রাজকুমারী, সিংহের চলন তার, নিজের তালে হেঁটে যায়, এদিক-ওদিক ভাল করে তাকিয়ে না দেখে ইঁদুরের উপর তার ভারী পা দিল চাপিয়ে। আর কি, ইঁদুর চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে মরে গেল।

প্রাচীন বচনঃ বেমানান জোড় বাঁধা থেকে সাবধান। অতি উচ্চাশা নিয়ে জোট গড়া মানে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা।

আমি বলিঃ খুব বড়দের থেকে দূরে দূরে থাকতে না পারলে যে কোন সময় তাদের নীচে চাপা পড়ে মরতে হতে পারে।

(২৮)
The Ass and the Charger

এক গাধা আর এক লড়াইয়ের ঘোড়া।

এক লড়াইয়ের ঘোড়া খুব যত্ন-আত্তিতে ছিল। এক গাধা তাই দেখে তাকে খুব করে বাহবা জানাল কারণ তার নিজের খুব অল্প-ই খাবার জুটত, আর সেটাও জুটত অনেক পরিশ্রম করে। কিন্তু একদিন সেখানে যুদ্ধ শুরু হতে সেই ঘোড়ার পিঠে অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত সৈনিক সওয়ারী চাপিয়ে তাকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হল। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে ঘোড়াটা এক সময় মারা পড়ল। সব দেখে শুনে গাধা তার মত পাল্টে ফেলে বলল, “ঐ লড়াইয়ের ঘোড়ার থেকে আমি কত ভাগ্যবান! আমি নিশ্চিন্তে বাড়ি আছি, আর ঐ লড়াইয়ের ঘোড়া যুদ্ধের ভয়াবহ সব যন্ত্রণা ভোগ করে মারা পড়েছে।”

প্রাচীন বচনঃ অন্যের ভাল অবস্থা দেখামাত্র তাকে হিংসা করার কোন অর্থ হয় না।

আমি বলিঃ বেশী, বেশী যত্ন-আত্তির সুখ বেশীদিনের জন্য নয়, বিপদ এল বলে। আর, যার আদর আহ্লাদ জোটে না, তার অতিরিক্ত কোন মাসুল গোণার-ও ভয় থাকে না।

(২৯)
The Vain Jackdaw

এক ফালতু পাতিকাক-এর গল্প

লোকে বলে, দেবরাজ ইন্দ্র যখন ঠিক করে ফেললেন যে পাখীদের জন্য রাজ্য গড়ে দেবেন, তিনি ঘোষণা দিয়ে দিলেন যে এক নির্দিষ্ট দিনে সব পাখীরা তাঁর সামনে এসে জড় হলে তিনি তাদের মধ্যে থেকে সবচাইতে যাকে সুন্দর দেখতে তাকেই পাখীদের রাজা বেছে নেবেন। এ কথা শুনে এক পাতিকাক, সে তো ভালমতই জানে কি কুচ্ছিৎ দেখতে তাকে, মাঠে-ঘাটে-বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে নানা পাখীদের গা থেকে খসা রকমারী সব পালক যোগাড় করে আনল। এরপর ঐ পালকগুলো নিজের সারা গায়ে গুঁজে নিয়ে খুব বাহার দিয়ে নির্দিষ্ট দিনে আর সব পাখীদের সাথে দেবরাজের সামনে হাজির হয়ে গেল। পাতিকাক-এর চেহারায় মুগ্ধ হয়ে দেবরাজ যেই প্রস্তাব রেখেছেন যে তাকে রাজা হিসেবে বেছে নেওয়া হোক, পাতিকাকের জোচ্চুড়িতে সমস্ত পাখীরা ভীষণ রেগে গিয়ে বিস্তর চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিল। আর সেই সাথে, প্রত্যেক পাখী পাতিকাক-এর গা থেকে নিজের নিজের পালক খুবলে খুবলে বার করে নিল। পাতিকাক তখন আবার এক মামুলি পাতিকাক হয়ে গেল।

প্রাচীন বচনঃ ধার করা সাজ-সজ্জায় কাজ হাসিল করতে পারার আশা না করাই ভাল।

আমি বলিঃ সমাজের দায়িত্বশীলরা যখন ঠাট-বাটকে মান্যতার মাপকাঠি করে ফোঁপরা বাহারী মানুষকে মাথায় বসান, তার মোকাবিলা করতে করতে ভুক্তভোগীদের আর অশান্তির শেষ থাকে না, মাথায় চড়া লোকটার-ও দুদিনেই আসল রূপ বেড়িয়ে পরে, কাজের কাজ পুরোই পন্ড।

(৩০)
The Milkmaid and her Pot of Milk

গোয়ালিনী আর তার মাথার দুধের বালতি

এক গোয়ালিনী মাথায় দুধের কলসী নিয়ে দুধ বেচতে চলেছে। চলতে চলতে মনটা তার খুশী খুশী হয়ে উঠেছে। “এই দুধ বেচে যা টাকা পাবো তাতে অন্তত তিনশ’ ডিম কিনে ফেলা যাবে। সেই ডিম দিয়ে মুরগীর চাষ শুরু করলে কিছু নষ্ট হলেও কম করে আড়াইশো মুরগীর ছানা পাওয়া যাবে। মুরগীর দাম যখন সবচেয়ে চড়ে উঠবে, এই মুরগীগুলো তখন বেচার জন্য তৈরী হয়ে গেছে। বছর শেষে যা টাকা হাতে জমবে তা দিয়ে একটা নুতন পোষাক কিনে ফেলব। সেটা পরে যখন আমি ক্রিসমাস-এর উৎসবে হাজির হবো, সব ছেলেগুলো আমায় পেতে চাইবে। কিন্তু আমি রাজী হচ্ছি না, পরিস্কার মাথা নেড়ে সব্বাইকে না করে দেব।” ভাবতে ভাবতে তার মাথাটা ভাবনার তালে তালে নড়ে গেল। ফলে মাথা থেকে দুধের কলসী মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে শত টুকরো হল, আর সেই সাথে অমন চমৎকার পরিকল্পনাগুলোও এক মুহুর্তে সব শেষ।

প্রাচীন বচনঃ ডিম ফোটার আগেই মুরগীর ছানার হিসেব করতে নেই।

আমি বলিঃ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার সময় এখন কি করছি সেটা ভুললে চলে না।

আগের পর্ব পরের পর্ব