ঈশপের গল্প (৫১ – ৫৫)

সমকালীন সমাজের সাথে কতটা প্রাসঙ্গিক এই গল্পগুলি সেই কৌতুহল থেকে কয়েকমাস আগে এদের ফিরে পড়তে আর সেই সাথে আমার অনুভব-এ অনুবাদ করতে শুরু করি। যত দিন গেছে তত অবাক হয়ে গেছি দেখে যে একের পর এক গল্পগুলি কি প্রবলভাবে আমাদের সময়ের কথা বলছে। এই গল্পগুলিতে যাঁরা মন্তব্য করেছেন তাঁরাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গল্পে একই অনুভব-এর কথা জানিয়েছেন। আসুন, দেখা যাক এবারের পঞ্চক-এ কি পাওয়া গেল।

অনুবাদ ইংরেজী পাঠের অনুসারী, আক্ষরিক নয়। সাথে আমার দু-এক কথা। 

গল্পসূত্রঃ R. Worthington (DUKE Classics)-এর বই এবং আন্তর্জাল-এ লভ্য http://www.aesop-fable.com -এ ইংরেজী অনুবাদের ঈশপের গল্পগুলি। 

গল্পক্রমঃ R. Worthington-এর বইয়ে যেমন আছে।

(৫১)
The Charcoal-Burner and the Fuller

এক কয়লা-বানিয়ে আর এক ঊল পরিস্কার করা লোক

কাঠ পুড়িয়ে কয়লা বানালে তাকে বলে কাঠ-কয়লা। একটি লোক কাঠ-কয়লার ব্যবাসা করত। নিজের বাড়িতেই সে কাঠ-কয়লা বানিয়ে নিত।
আর একটি লোক ছিল যে ঊল-এর জামা-কাপড় বানানোর জন্য ঊল পরিস্কার করার কাজ করত। সেও নিজের বাড়িতেই থেকেই ঊল কাচাকাচি করত।
কাঠ-কয়লা বানানোর লোকটির সাথে একদিন ঊল-কাচিয়ে লোকটির পরিচয় ঘটল। এ-কথা সে-কথার পর কাঠ-কয়লা বানানো লোকটি তার নুতন বন্ধুকে তার নিজের বাড়িতে উঠে আসার প্রস্তাব দিল। বলল এতে দু’জনের-ই অনেক খরচ বেঁচে যাবে, দু’জনের-ই কত সুবিধা হবে। ঊল-কাচিয়ে বলল, “অসম্ভব, আমার পক্ষে সেটা মোটেও সুবিধার হবে না। আমি যা কেচে-কুচে সাফ করব তোমার কাঠ-কয়লার গুঁড়োয় তা সাথে সাথে কালো হয়ে যাবে।”

প্রাচীন বচনঃ এক রকমদের-ই এক সাথে থাকা চলে।

আমি বলিঃ যাদের সঙ্গে জুটিয়ে নিলেন তারা যদি খারাপ হয়, আপনি নিজে যতই ভাল হওয়ার চেষ্টা করুন, সমস্ত চেষ্টা বৃথা হয়ে যেতে একটুও দেরী হবে না।

(৫২)
The Bull and the Goat

ষাঁড় আর ছাগলের গল্প

এক বার এক ষাঁড় একটা সিংহের তাড়া খেয়ে পালাতে পালাতে একটা গুহায় গিয়ে ঢুকে পড়ল। ঐ গুহায় এর আগে একদল ছাগলচরিয়ে লোক থাকত। কয়েকদিন আগে তারা গুহা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় একটা ছাগল ঐ গুহায় রয়ে গিয়েছিল। ষাঁড়টাকে গুহার মধ্যে দেখে সেই ছাগলটা শিং বাগিয়ে তেড়ে এল। ষাঁড়-এর শিং-এ শিং আটকে ষাঁড়টাকে সে ঠেসে ধরল। বাইরে সিংহটা তখন-ও পায়চারী করছে। ফলে ঐ ষাঁড় তখনকার মত হার মেনে নিল। তারপর ছাগলটাকে বলল, “লড়ে নে যত পারিস। তা’ বলে ভাবিসনা যে তোকে আমি একটুও ভয় পেয়েছি। আমার ভয় ঐ সিংহটাকে। একবার ওটা এখান থেকে চলে যাক, দেখ তারপর কি দশা আমি করি তোর, তখন বুঝবি তুই কার জোর কতটা।”

প্রাচীন বচনঃ অন্যের দুর্দশার সুযোগ নেওয়া অত্যন্ত নোংরা কাজ।

আমি বলিঃ বড় বিপদ সামলানোর সময় ধৈর্য্য ধরে রাখতেই লাগে। সেই সময় যে সব ছোট ছোট শত্রুরা সুযোগ নেয়, বড় বিপদ কেটে গেলে পর তাদের জন্য ব্যবস্থা নিতে আর বড় অসুবিধা হয় না।

(৫৩)
The Lion and the Mouse

সিংহ আর ইঁদুরের গল্প

একদিন একটা ইঁদুর এক ঘুমন্ত সিংহের মুখের উপর দিয়ে ছুটে গেল। সিংহের ঘুম গেল ভেঙ্গে আর ভীষণ রাগে সে খপ করে ইঁদুরটাকে ধরে ফেলল। মুঠোর মধ্যে সে এবার ইঁদুরটাকে পিষে মেরে ফেলবে। ইঁদুরটা তখন খুব করুণ স্বরে তাকে মিনতি জানাল, “দয়া করে আমার প্রাণ বাঁচান, আমায় ছেড়ে দিন। কোন একদিন আমি ঠিক আপনার এই দয়ার প্রতিদান দেব।” সিংহ হেসে উঠে তাকে ছেড়ে দিল। এর কয়েকদিন বাদেই সেই সিংহ একদল শিকারীর হাতে ধরা পড়ল। শিকারীরা শক্ত দড়ি দিয়ে মাটিতে গাঁথা খুঁটির সাথে সিংহকে বেঁধে রেখে দিল। তার গর্জন শুনে তাকে চিনতে পারে সেই ইঁদুর তখন সিংহের কাছে এসে হাজির হল। কুটকুট করে তার ধারাল দাঁত দিয়ে সেই ইঁদুর সিংহের দড়ি কেটে তাকে মুক্ত করে দিল। তারপর তাকে বলল, “সেদিন আপনাকে আমার সাহায্য করতে পারার কথায় আপনি আমায় উপহাস করেছিলেন। আপনি ভাবতেই পারেননি যে আমি কোনদিন আপনার দয়ার প্রতিদান দিতে পারব। এখন দেখলেন তো, তেমন তেমন সময়ে এমনকি একটা ইঁদুর ও এক সিংহের উপকারে আসতে পারে।”

প্রাচীন বচনঃ ভাল কাজ করার জন্য কেউই তুচ্ছ নয়।

আমি বলিঃ কার কাছ থেকে কখন কোন উপকার আসবে কেউ জানে না। তাই বুদ্ধিমান লোকেরা ছোট-বড় কাউকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য দেখায় না।

(৫৪)
The Horse and the Ass

ঘোড়া আর গাধা

রাজপথ ধরে চলেছিল এক ঘোড়া। নিজের সুন্দর নকশাদার রেকাব, জিন, লাগাম এসব নিয়ে তার বিরাট গর্ব। চলতে চলতে সামনে পড়ল এক গাধা, পিঠে তার অনেক বোঝা। ভারের চাপে গাধা চলেছে আস্তে, আস্তে। অহংকারে মটমট করা ঘোড়া তাকে বলল, “আমার খুরের এক লাথি মেরে কেন যে তোকে এখনো সরিয়ে দিচ্ছি না, জানি না।” গাধা শান্তভাবে চুপ করে রইল। শুধু মনে মনে ভগবানের কাছে উপযুক্ত বিচারের জন্য প্রার্থনা জানাল। বেশীদিন যায়নি তার পর যেদিন শ্বাসকষ্টের রোগ ধরা পড়ায় ঐ ঘোড়াকে তার মালিক গ্রামের খামারবাড়িতে পাঠিয়ে দিল। সেখানে তার কাজ জুটল ময়লা ফেলার গাড়ি টানা। ঐ অবস্থায় একদিন আবার তার সাথে সেই গাধার দেখা। গাধা তখন তাকে টিপ্পনী কেটে বলল, “কি হে অহংকারী, কোথায় গেল তোমার ঐ সব কারুকাজ করা সাজ-সজ্জা! যা নিয়ে অত নাক সিঁটকয়েছিলে এখন নিজেই তো দেখছি সেই অবস্থায় নেমে এসেছ!”

প্রাচীন বচনঃ যে জিনিস নিজের অধিকারে নেই তা নিয়ে অহংকার করা বোকামী।

আমি বলিঃ মিডিয়ার ফুল-চন্দন পেয়ে ফুলতে থাকা বোকারা খেয়াল রাখে না যে এ সব জাঁকের সাজ-সজ্জা মিডিয়ার মর্জিতে জুটেছে। একটা সময় মিডিয়ার-ই মর্জি মাফিক ঐ মিডিয়ার ময়লা বোঝাই গাড়ি টানতে টানতেই দিন কাটে তাদের।

(৫৫)
The Old Hound

বুড়ো শিকারী কুকুর

এক শিকারী কুকুর তার যৌবনকালে খুব শক্তিশালী ছিল। কোনদিন বনের কোন জানোয়ারের কাছে সে হার মানে নি। পরে যখন সে বুড়ো হয়ে গেছে, একদিন শিকারের সময় সে একটা শূয়োরের পিছু ধাওয়া করল। ছুটতে ছুটতে শূয়োরটা যখন নাগালের মধ্যে এসে গেল, কুকুরটা ভীষণ সাহসের সঙ্গে তার একটা কান কামড়ে ধরল। কিন্তু এতদিনে তার দাঁত ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে, কামড়ের আর সেই জোর নেই। শূয়োরটা পালিয়ে গেল। কুকুরের মালিক দৌড়ে এসে দেখে শিকার হাতছাড়া হয়ে গেছে। ভীষন বিরক্ত হল সে। যাচ্ছেতাই করে বকাবকি করল তার কুকুরকে। কুকুরটা তখন তার মালিকের দিকে মাথা উঁচু করে তাকাল, তারপর বলল, “আমার কোন দোষ ছিল না মালিক। আমার ইচ্ছা বা চেষ্টা কোনটার-ই কোন কমতি করিনি আমি। কিন্তু আমার শরীরের ক্ষমতার উপর আমার কোন হাত নেই। আজকে আমি কি করে উঠতে পারিনি তার জন্য আপনি আমায় দোষ দিচ্ছেন। অথচ, এতদিন ধরে যা করে এসেছি সেটা মনে রেখে আমাকে আপনার প্রশংসাই করার কথা ছিল।”

প্রাচীন বচনঃ শারীরিক অক্ষমতার কারণে কাউকে দোষ দেওয়া উচিত নয়।

আমি বলিঃ আগে সে কত কাজ করেছে সেটা মনে রাখে কাজটা যে করেছে সে নিজে। কাজের ফল যে ভোগ করে সে ঐ লোকের প্রাপ্য ঠিক করে এখন তার কাছ থেকে কি পাওয়া যাবে সেই হিসাবের উপর।