ঈশপের গল্প (৬১ – ৬৫)

এবারে কোন কোন গল্পে ইশপের আয়নায় ধরা পড়েছে এই হতভাগা অনুবাদকের নিজের ছবি। বাকিগুলিতে অন্যান্য বারের মতন-ই চিরকাল এবং সমকাল।

অনুবাদ ইংরেজী পাঠের অনুসারী, আক্ষরিক নয়। সাথে আমার দু-এক কথা।
গল্পসূত্রঃ R. Worthington (DUKE Classics)-এর বই এবং আন্তর্জাল-এ লভ্য http://www.aesop-fable.com -এ ইংরেজী অনুবাদের ঈশপের গল্পগুলি।
গল্পক্রমঃ R. Worthington-এর বইয়ে যেমন আছে।

(৬১)
The Seaside Travelers

সাগরতীরের পর্যটক

সমুদ্রের ধার ধরে ঘুরতে ঘুরতে কিছু পর্যটক একটা উঁচু টিলা দেখতে পেয়ে তার চূড়ায় উঠে গেল। সেই চূড়া থেকে তাকিয়ে তাদের মনে হল অনেক দূরে একটা বড় জাহাজ দেখা যাচ্ছে। খুব আশা নিয়ে তারা অপেক্ষা করতে রইল কখন সেই জাহাজ নীচের বন্দরে এসে ভিড়বে। কিন্তু হাওয়ায় ভেসে সেই দূরের জিনিস যখন কিছুটা কাছে এল তারা বুঝতে পারল যে এ বড় জোর একটা ছোট নৌকা হতে পারে, কোন বড় জাহাজ কোন ভাবেই নয়। শেষ পর্যন্ত সেই বস্তু যখন তীরে এসে লাগল তখন দেখা গেল কোথায় কি, অনেক ভাঙ্গা ডালপালা একসাথে জড়ো করে বাঁধা এক বড়সড় বোঝা, এই মাত্র। হতাশ হয়ে একজন তখন তার সঙ্গীদের বলল, “শুধু শুধুই এতক্ষণ অপেক্ষা করে জুটল কি – এক গুচ্ছ কাঠির আঁটি।”

প্রাচীন বচনঃ জীবনের অনেক আশাই সম্ভাব্যতার বিচারে অবাস্তব কল্পনার বেশী কিছু আর হয়ে উঠতে পারে না।

আমি বলিঃ ছোটাছুটি করে কম্পিউটার-এর সামনে বসে পড়ে ভাবি এইবার একটা দুরন্ত লেখা নামিয়ে ফেলব! নামে (এক বান্ডিল কাঠির আঁটি) দু-তিনটে ছেঁড়াখোঁড়া লাইন!

(৬২)
The Sea-gull and the Kite

সমুদ্রচিল আর ডাঙ্গার চিল

এক ছিল সমুদ্রচিল। ডাঙ্গায় হাঁটার থেকে সমুদ্রে সাঁতার কাটাই তার কাছে অনেক সহজ লাগত। সাঁতার কাটতে কাটতে জল থেকে তাজা মাছ ধরে খেত সে। একদিন একটা খুব বড় মাছ গিলতে গিয়ে গলায় আটকে মারা পড়ল বেচারি। সমুদ্রের তীরে ভেসে এল তার শরীর। একটা চিল আকাশে উড়তে উড়তে দেখছিল তাকে। তার হিসাব মত এ-ও যা সে নিজে অর্থাৎ একটা ডাঙ্গার চিল-ও তাই। আর সেই হিসেব থেকেই সে সিদ্ধান্তে এল, “ঠিক-ই আছে; একটা পাখীর কাজ বাতাসে ভাসা। সে যদি এখন জলের থেকে খাবার জোগাড়ের চেষ্টা করে তবে ত তার এই দশাই ঘটা উচিত।”

প্রাচীন বচনঃ নিজে যতটুকু বোঝা যায় ততটুকু পর্যন্তই হিসাব করা ভাল।

আমি বলিঃ ধান্দাবাজের মাপকাঠিতে দেশপ্রেম, যুদ্ধাপরাধীর বিচার চেয়ে লড়ে যাওয়া এ সমস্ত নিতান্তই বেকুবী কাজ আর, বেকুবদের ত মারা পড়াই উচিত!

(৬৩)
The Monkey and the Camel

বানর আর উট-এর গল্প

জঙ্গলে পশুদের জোর আমোদ-আহ্লাদ চলছিল। এক বানর একসময় উঠে এসে চমৎকার এক নাচ দেখিয়ে দিল। দর্শক-শ্রোতারা ত মহা খুশী। তাদের তুমুল হাততালির মধ্যে বানর ফিরে গিয়ে নিজের জায়গায় বসল। বানরের এত প্রশংসা দেখে এক উটের খুব হিংসে হল। তার ইচ্ছে হল সবাই এবার বানরকে ছেড়ে তার দিকে তাকাক, তার সুখ্যাতি করুক। তাই সকলকে খুশী করার জন্য সে ও একটা নাচ দেখাতে চাইল। কিন্তু শুরুতেই এমন কিম্ভুত ল্যাগব্যাগ করে সে এগিয়ে এল যে সেই দেখে বাকি জন্তুদের গা গুলিয়ে উঠল। সবাই মিলে লাঠিপেটা করে তাকে জলসা থেকে বার করে দিল।

প্রাচীন বচনঃ সেরাদের নকল করতে যাওয়া বোকামি।

আমি বলিঃ নকলনবিশ নিঘিন্নেরা যখন চারপাশে গলাধাক্কা খাওয়ার বদলে হাততালি কুড়ায় তখন বুঝি মিডিয়া কি জিনিষ! (ইচ্ছে ছিল লিখি নকলনবিশ নিঘিন্নেদের জন্য গলাধাক্কাই অনিবার্য পরিণতি; পারলাম না।)

(৬৪)
The Rat and the Elephant

ইঁদুর আর হাতির গল্প

এক ইঁদুর চলেছিল বড় রাস্তা ধরে। পথে পড়ল এক বিরাট হাতি। হাতির পিঠে রাজকীয় হাওদায় আসীন তার মালিক মহামহিম স্বয়ং। আর রয়েছে মালিকের প্রিয় কুকুর আর বিড়াল, এবং টিয়া, আর বানর। বিশাল প্রাণীটা আর তার পরিচারকদের পিছন পিছন চলেছিল বিশাল এক জনতা – জয়ধ্বনি দিতে দিতে, গোটা পথ জুড়ে। সব দেখেশুনে ইঁদুর রেগে আগুন। ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে সেই জনতাকে বলল সে, “এত বোকা কেন তোমরা, একটা হাতিকে নিয়ে এমন মাতামাতি করছ? কিসে এত মুগ্ধ তোমরা? ওর বিশাল আকার দেখে? বলি, ঐ গোব্দা চেহারায় কোন কাজটা হয় শুনি, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ভয় পেয়ে যাওয়া ছাড়া? আর সেই ভয় দেখানো – সে তো আমিও পারি। ও যেমন একটা জন্তু, আমিও কি তাই নই? ওর যতগুলো পা, আর কান আর চোখ, আমার ও সেগুলো ঠিক ততগুলোই আছে। ওর কোন অধিকার নেই গোটা পথ আটকে নিয়ে চলার। এই পথ যতটা ওর ততটাই আমার ও।” ঠিক এই সময়ই হাতির পিঠ থেকে বিড়াল-এর নজর পড়ল ইঁদুর-এর উপর। লাফিয়ে নীচে নেমে এল সে। একটুক্ষণ-এর মধ্যেই সে ইঁদুরকে বুঝিয়ে দিল যে ইঁদুর আর যাই হোক, হাতি নয়।

প্রাচীন বচনঃ কোন বিরাট লোকের একটা কিছুর সাথে নিজের মিল পাওয়া মানেই সেই লোকের সাথে সমান হয়ে যাওয়া নয়।

আমি বলিঃ দু’-চারটা ঈশপের গল্প অনুবাদ করলেই মনে রাখার মত লেখক হওয়া যায় না।

(৬৫)
The Fisherman Piping

বাঁশি বাজানো জেলে

এক জেলে খুব ভালো বাঁশী বাজাত। একদিন সে মাছ ধরতে যাওয়ার সময় জাল-এর পাশাপাশি তার বাঁশীটাও সঙ্গে নিয়ে নিল। তারপর জলের উপর ঝুঁকে আসা এক পাথরের নীচে সে বিছিয়ে রাখল তার জাল আর, পাথরের উপর বসে বাজাতে লাগল বাঁশী, কত রকমের কত যে তানে! মনে আশা, বাঁশীর মধুর সুরে মুগ্ধ হয়ে মাছেরা নিজে থেকে নাচতে নাচতে এসে ধরা দেবে তার জালে। হায়! বহুক্ষণ বাঁশী বাজিয়েও একটা কুচো মাছেরও দেখা মিলল না। তখন সে সরিয়ে রেখে দিল তার বাঁশী, হাতে তুলে নিল জাল আর জলে ছুঁড়ে মারল সেটা, যেভাবে সে ছুড়ে দেয় রোজ। তারপর আর কি, জাল টেনে তুলে আনল অঢেল মাছ।

প্রাচীন বচনঃ যে কাজ যেভাবে করার কথা সেভাবে করলেই কাজ হয়।

আমি বলিঃ আইনপ্রয়োগে যাদের ধরার কথা বিবেকের বাণী শুনিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না।