ঈশপের গল্প (৭১ – ৭৫)

(৭১)
The Shepherd and the Sheep

ভেড়ার রাখাল আর তার ভেড়ারা

এক রাখাল তার ভেড়াদের নিয়ে চরতে চরতে এক বিরাট ওক গাছের নীচে এসে হাজির হল। গাছ তখন ফলে ভরে আছে। রাখাল তার গায়ের চাদরটা গাছতলায় বিছিয়ে দিল। তারপর গাছে চড়ে ডাল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ফলগুলো নীচে, চাদরের উপর ফেলতে লাগল। ভেড়াগুলো সেই ফলগুলো খাওয়ার সময় চাদরটাকেও ছিঁড়ে চিবিয়ে নষ্ট করে ফেলল। রাখাল গাছ থেকে নেমে চাদরের অবস্থা দেখে আর্তনাদ করে বলল, “হতচ্ছাড়া বেইমান জানোয়ারের দল, দুনিয়ার লোকের ঊলের যোগান দিস তোরা, আর যে তোদের খাবার যোগান দেয়, তার চাদরটাই তোরা কুচি করে রাখলি! ”

প্রাচীন বচনঃ যে সেবা যত্ন করে তার-ই ক্ষতি করার মত অকৃতজ্ঞতার থেকে বড় নীচতা আর নেই।

আমি বলিঃ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে, জনগনের টাকায় প্রতিপালিত হয়ে তারপর জনগণের-ই সাথে যারা বেইমানি করে তাদের জন্য কোন ধিক্কার-ই যথেষ্ট নয়।

(৭২)
The Fox and the Crow

শেয়াল আর কাক

এক কাক এক টুকরো মাংস চুরি করে এক উঁচু গাছের ডালে গিয়ে বসল। মাংসের টুকরোটা তার দু’ ঠোঁটের মাঝখানে ধরা। এই সময় এক শেয়াল তাকে দেখতে পেয়ে এক শয়তানী ফন্দী আঁটল। উদ্দেশ্য, ঐ মাংসের টুকরোটা হাতিয়ে নেওয়া। “কাকের চেহারাটা কি সুন্দর!” গাছতলায় এসে কাককে শুনিয়ে শুনিয়ে খুব অবাক হওয়ার ভান করে বলল সে, “যেমন দেখবার মত তার শরীরের গঠন, তেমন চমৎকার তার গায়ের রং। শুধু গলার স্বরটাও যদি তার চেহারাটার মত একইরকম চিকণ হত, অনায়াসে তাকে পাখীদের রাণী বলা যেত।” মুখে যখন সে এই সব ছল-চাতুরীর কথা বলে যাচ্ছিল, তখন আসলে তার মন পড়েছিল ঐ মাংসের টুকরোটার প্রতি। কাক-এর দেমাক ত এই তোষামুদে প্রশংসায় খুব ফুলে উঠল। সে এখন চিন্তায় পড়ে গেল তার গলার আওয়াজের দুর্নাম নিয়ে। তার মনে হল সব্বাইকে জানিয়ে দেওয়া দরকার যে তার গলার স্বর কারো থেকে খারাপ নয়। সে এক বিরাট আওয়াজে কা করে ডেকে উঠল। আর, টুপ করে মাংসটা তার মুখ থেকে খসে পড়ে গেল। শেয়াল সঙ্গে সঙ্গে মাংসটা তুলে নিল আর, কাককে ডেকে বলল, “ওহে কাক সুন্দরী, তোমার গলার স্বর যথেষ্টই ভাল, শুধু, বুদ্ধিটাই নেই তোমার!”

প্রাচীন বচনঃ তোষামোদে যে ভুলে যায় সে লোক বোকা, কারণ তোষামোদ-এর উদ্দেশ্য কখনো ভাল থাকে না।

আমি বলিঃ তোষামোদে ঘায়েল হয় না এমন লোক পাওয়া কঠিন।

(৭৩)
The Swallow and the Crow

বাহারী ডানার আবাবিল পাখী আর কাক

আবাবিল পাখীর পালকগুলি যেমন রঙ্গীন তেমন সুন্দর করে সাজানো। আর কাকের পালকগুলি যত মসৃণ আর চকচকেই হোক, সেগুলি একরঙ্গা, সাজসজ্জাও বিশেষ কিছু নেই। কার পালক-সজ্জার কদর বেশী হওয়া উচিত এই নিয়ে দুজনের মধ্যে জোর বিবাদ ছিল। শেষে কাক একদিন এক মোক্ষম যুক্তি দিয়ে সব বিবাদের অবসান করে দিল। কাক জানিয়ে দিল যে তার পালক-সজ্জার দামটাই বেশী কারণ, আবাবিল-এর পালকের যত বাহার বসন্তকালে। শীতকালে আবাবাবিল-এর দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু কাকের শীতকালে ঘুরে বেড়াতে কোন অসুবিধা হয় না কারণ, শীতের ঐ কঠিন ঠান্ডাতেও তার পালকগুলো তাকে ভালমত রক্ষা করে।

প্রাচীন বচনঃ সুসময়ের বন্ধুদের বেশী দাম দিতে নেই।

আমি বলিঃ কঠিন সময়ে যারা পাশে থাকে, সাহায্য করে, তারাই আসল বন্ধু।

(৭৪)
The Hen and the Golden Eggs

মুরগী আর তার সোনার ডিম

একটি লোক আর তার বউ-এর একটা বিশেষ মুরগী ছিল। মুরগীটা রোজ একটা করে সোনার ডিম পাড়ত। একদিন সেই লোক আর তার বউ ভাবল, মুরগীটার পেট ভর্তি নিশ্চয়ই অনেক সোনার ডিম আছে। তারা ঠিক করল একসঙ্গে সব কটা সোনার ডিম বার করে নেবে। মুরগীটার পেট কেটে সেটাকে মেরে ফেলল তারা। আর তারপর, অবাক হয়ে দেখখল, অন্য যে কোন মুরগীর মত, এই মুরগীটার পেটেও কোন ডিম নেই। বোকা লোভীদুটো এইভাবে রাতারাতি বড়লোক হতে গিয়ে নিশ্চিন্তে রোজ যেটা পাচ্ছিল সেটাও হারিয়ে বসল।

প্রাচীন বচনঃ লোভ এর পরিণতি সর্বনাশ।

আমি বলিঃ মাত্রাতিরিক্ত লাভের নেশায় মেতে গেলে চালু ব্যবসাও ডুবে যায়।

(৭৫)
The Old Man and Death

এক বুড়ো আর মৃত্যু দেবতা

এক বুড়ো লোকের কাজ ছিল বন থেকে গাছ কেটে সেই কাঠকুটো শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রী করা। লম্বা পথ ধরে যেতে যেতে একদিন বুড়ো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ল। কাঁধ থেকে কাঠের বোঝা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে পথের ধারে বসে পড়ল সে। আর তারপর ক্ষোভে-দুঃখে বলে উঠল যে এখনো “মরণ” আসছে না কেন! “মৃত্যু দেবতা” এই কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে হাজির হয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করল কেন সে তাকে ডাকাডাকি করছে। বুড়ো তখন তাকে বলল, “তেমন কিছু না, এই বোঝাটা যদি একটু কষ্ট করে আমার কাঁধে তুলে দেন, বড় ভাল হয়।”

প্রাচীন বচনঃ মুখে যা বলা হয় সবসময় সেটাই মনের কথা থাকে না।

আমি বলিঃ গরীব মানুষ মৃত্যুর দেবতাকে একবার ডাক দিতেই সে হাজির হয়ে যায় আর, টাকা-পয়সার দেবতাকে সারাজীবন ডেকেও সাড়া মেলে না।