ঈশপের গল্প (৮১ – ৮৫)

ঈশপের গল্পগুলি একই সাথে সমকালীন এবং চিরকালের। বারে বারে পড়ার মত গল্পগুলিকে একালের বাংলা ভাষায় আমার নিজের মত করে ধরে রাখার ইচ্ছের ফসল এই লেখা।

অনুবাদ ইংরেজী পাঠের অনুসারী, আক্ষরিক নয়। সাথে আমার দু-এক কথা।
গল্পসূত্রঃ R. Worthington (DUKE Classics)-এর বই এবং আন্তর্জাল-এ লভ্য http://www.aesop-fable.com -এ ইংরেজী অনুবাদের ঈশপের গল্পগুলি।
গল্পক্রমঃ R. Worthington-এর বইয়ে যেমন আছে।

(৮১)
The Cat and the Cock

এক বিড়াল আর এক মোরগ

একটা বিড়াল একবার একটা মোরগকে পাকড়ে ফেলল। এইবার বিড়ালটা মনে মনে ফন্দী আঁটতে থাকল কোন ছুতোয় মোরগটাকে খেয়ে ফেলা যায়। বিড়াল মোরগকে দোষ দিল যে সে লোকজনের পক্ষে এক মহা উৎপাত। কারণ দেখাল এই যে, রাত থাকতে থাকতেই মোরগ কোঁকর কো করে ডাকাডাকি শুরু করে দ্যায়, ফলে লোকেরা ঠিকমত ঘুমাতে পারে না। মোরগ নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দিল এই বলে যে এতে ত লোকজনের সুবিধাই হয়, তারা আগে আগেই উঠে পড়তে পারে আর সময় থাকতে থাকতেই কাজে লেগে যেতে পারে! বিড়াল উত্তরে বলল, “খুব ভালই জবাব দিয়েছিস তুই, কিন্তু তা বলে আমি ত আর উপোস থাকতে পারি না!” এই কথা বলেই বিড়াল মোরগটাকে মেরে খেয়ে ফেলল।

প্রাচীন বচনঃ যে জেনেশুনে মিথ্যা দোষারোপ করে তাকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে কোন লাভ হয় না।

আমি বলিঃ নিজের শয়তানীকে জায়েজ দেখাতে না পারলে সমস্ত যুক্তি ছুঁড়ে ফেলে দিতে শয়তান এক মুহূর্তও দেরী করে না।

(৮২)
The Wolf and the Horse

নেকড়ে আর ঘোড়ার গল্প

এক নেকড়ে একবার একটা জই ক্ষেত থেকে বের হয়ে দেখে সামনে একটা ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে। তখন সে ঘোড়াটাকে ডেকে বলল, “ঢুকে পড়ো, ঢুকে পড়ো, এই জই-এর ক্ষেতে ঢুকে পড়ো। একেবারে সেরা জাতের জই হয়ে আছ। আমি কিন্তু একটা দানাও নষ্ট করিনি, সব তোমার জন্য রেখে দিয়েছি। কি জানো, তুমি হচ্ছ আমার বন্ধুলোক। তোমার দাঁতের ঘষায় ঘষায় জই গুঁড়ো গুঁড়ো হচ্ছে, সে আওয়াজ আহা, শুনলেও আমার ভাল লাগে!” ঘোড়া জবাব দিল, “শোন হে নেকড়ে, তুমি যদি নিজে জই খেতে পারতে, কানের বদলে তোমার পেটের সুখের দিকেই তুমি নজর রাখতে। ”

প্রাচীন বচনঃ একবার বদমাইস হিসেবে নাম রটে গেলে, তার পরে আর ভাল কাজ করলেও কেউ সে কাজ ভাল বলে বিশ্বাস করে না।

আমি বলিঃ বদমাইস কখনো নিজের ক্ষতি করে কারো সাথে দোস্তি করে না।

(৮৩)
The Two Soldiers and the Robber

দু’জন সৈন্য আর এক ডাকাত

একদিন দু’জন সৈন্য একসাথে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ একটা ডাকাত তাদের উপর চড়াও হল। সৈন্যদের একজন পালিয়ে গেল। অন্যজন তলোয়ার বাগিয়ে জোরদার লড়াই দিল। ডাকাতটা যখন মারা পড়ল, সেই পালিয়ে যাওয়া ভীতু সৈন্যটা তখন ফিরে এল। এসেই সে তার জোব্বাটা ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর খাপ থেকে তরোয়াল বার করে লাগিয়ে দিল জোর হাঁক-ডাক, “এখুনি আমি হতচ্ছাড়া ডাকাতের মজা দেখাচ্ছি। এমন শিক্ষা দেব ওদের যে, হাড়ে হাড়ে টের পাবে কার সাথে লাগতে এসেছিল!” ডাকাতের সাথে লড়ে-যাওয়া সৈন্যটি এই সব শুনে বলল, “হাঃ, একটু আগে যখন আমি লড়াই করছিলাম, ঠিক সেই সময়টায়, কিছু না হোক এই কথাগুলোই যদি তুমি বলতে! তোমার কথায় বিশ্বাস করে আমি অন্ততঃ আরো একটু মনের জোর নিয়ে লড়ে যেতে পারতাম! তোমার তলোয়ার এখন তুমি বরং খাপেই ভরে রাখো। আর ফালতু কথাগুলোও বন্ধ করো। যারা তোমায় চেনে না, তাদের তুমি এর পরেও যে ঠকিয়ে যাবে সে আমি জানি। কিন্তু, আমি ত দেখেছি কত তাড়াতাড়ি কি দৌড়টাই তুমি লাগিয়েছিলে! তোমার বীরত্বে ভরসা রাখার মত লোক আর যেই হোক, আমি নই আর!”

প্রাচীন বচনঃ একবার যে কাপুরুষের রূপ বেড়িয়ে পড়েছে, তার বীরত্বের আস্ফালন-এ কেউ আর পাত্তা দেয় না।

আমি বলিঃ যে যত আগে আগে পালায়, বিপদ কেটে গেলে সে তত বড় বড় কথা বলে।

(৮৪)
The Monkey and the Cat

বানর আর বিড়াল-এর গল্প

এক সময় এক বানর আর এক বিড়াল এক সাথে এক পরিবারের মত থাকত। দু’জনেই ছিল মহা চোর, কেউ কারো থেকে কম যেত না। একদিন দু’জনে একসাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ঘুরতে ঘুরতে নজরে পড়ল এক জায়গায় গরম ছাই চাপা দিয়ে বাদাম সেঁকা হচ্ছে। ধূর্ত বানর তাই দেখে বলল, “এসো এসো, আজ রাতের ভোজের ব্যাবস্থা হয়ে গেল মনে হচ্ছে। আমার থেকেও তোমার নখগুলো এখন বেশী কাজে দেবে। তুমি যদি এই গরম ছাই-এর ভিতর থেকে বাদাম-গুলো বার করে আনতে পারো, যা পাবে তার অর্ধেক তোমার।” বিড়াল ছ্যাঁকা খেয়ে, থাবা পুড়িয়ে একটা একটা করে বাদাম বার করে আনল। সমস্ত বাদাম চুরির শেষে দেখতে পেল বানরটা সব কটা বাদাম খেয়ে ফেলেছে!

প্রাচীন বচনঃ চোরকে চোরের ও বিশ্বাস করতে নেই।

আমি বলিঃ চোরে চোরের থেকেও চুরি করতে ছাড়ে না। তার পরেও যখন কোন লোক চোরকে বিশ্বাস করে, সে লোকের যে সর্বস্ব খোয়া যাবে এতে আর অবাক হওয়ার কিছু তাকে না। অবাক লাগে যে চারপাশে এমন লোকের কোন কমতি দেখি না।

(৮৫)
The Two Frogs

দুই ব্যাঙের গল্প

এক পুকুড়ে এক সাথে থাকত দুই ব্যাঙ। এক বছরে গরম কালে সেই পুকুরের সব জল শুকিয়ে গেল। ব্যাঙরা দু’জনে তখন নুতন ঘরের খোঁজে বের হয়ে পড়ল। যেতে যেতে পথে একটা কূয়ো দেখতে পেল তারা। এক ব্যাঙ বলল, “চলো, চলো এই কূয়োতেই নেমে পড়ি। এখানেই ডেরা বেঁধে ফেলা যাক।” অন্য ব্যাঙটি সাবধানী। সে বলল, “কিন্তু ধরো, কূয়োয় নেমে দেখা গেল জল নেই। এই ভীষণ গভীর কূয়ো থেকে ত উঠেও আসা যাবে না! তখন কি হবে!”

প্রাচীন বচনঃ পরিণতির হিসাব না করে কাজ করতে নেই।

আমি বলিঃ সাবধানী পরিকল্পনা সেটাই যেটায় পরিকল্পনা কাজ না করলে কি ভাবে তার ফলে তৈরী হওয়া বিপদ থেকে বের হয়ে আসা যাবে সেটাও পরিকল্পনা করা থাকে।