ক্যালিডোস্কোপ – ১

দূরবীন দিয়ে দেখতে চেষ্টা করেছিলাম পার হয়ে আসা জীবন নাটক। কিছু ভুল, কিছু ফাউ প্রাপ্তির গল্পের পর থমকে গিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে মিলে গেল ক্যালিডোস্কোপ।

তিন আয়নাভরা একটা নলের এক প্রান্তে কয়েকটা রঙ্গীন, হালকা, টুকিটাকি টুকরো – ভাঙ্গা চুড়ি, ছোট্ট পুঁতির দানা। নল ঘোরে, আয়না ঘোরে, টুকরোরা ঘুরে ঘুরে রচনা করে ছবির পর ছবি, অজস্র, অফুরান। ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় খেলনাগুলোর একটা ছিল এই খেলনাটা। আয়নামতি-দিদি সে কথা জানতে পেরে আশ্চর্য সুন্দর একটা কবিতা পড়াল আমায় – ক্যালিডোস্কোপ। কবি ইন্দিরা দাশ। কবিতার ধরতাই – “চলো ক্যালিডোস্কোপ‘টা ভরে জীবনটা দেখে নিই একবার।”

নির্দিষ্ট কোন পরম্পরার বাধ্য-বাধকতা নয়। যখন যেমন ইচ্ছে করবে, যখন যেমন মনে পড়বে। এক-ই ঘটনা হয়ত উঠে আসবে, বারে বারে, অন্য অন্য ছবি হয়ে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকি। শুধু আমার নিজের জীবন-ই দেখব কি? কে জানে! হয়ত অন্য কোন দেখা জীবন ও … কোন শোনা জীবন … । দেখতে থাকি।

এখন ফিরে চলি সেইখানে, যেখানে আগের লেখায় ছেড়ে এসেছিলাম – উত্তরবঙ্গ, উত্তরবঙ্গের কোচবিহার (ইংরেজী বানানে কুচবিহার)। আমি পড়ি তৃতীয় শ্রেণীতে, মেজ ভাই প্রথম শ্রেণী। ছোটজন ঘরে খেলা করে। কোন কিন্ডার গার্টেনের গল্প ছিল না আমাদের। কোন প্রাইভেট টিউশন-এর বেদম দৌড় ছিল না। আমরা দৌড়তাম রাস্তায় রাস্তায়। আমার জীবনে বাংলার মাটির সবচেয়ে কাছের জীবন ছিল সেই অসামান্য দিনগুলো। আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পিছনে তাকিয়ে সেই দিনগুলো দেখতে বসে প্রথমেই ভেসে এল – বৃষ্টি।

উত্তরবঙ্গে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমার বৃষ্টির স্মৃতি শুধু বাঁচিয়ে চলার স্মৃতি। একটা কালো ছাতার সাহায্যে নিজেকে বাঁচানো, বই-খাতার ব্যাগ বাঁচানো। ছাতার আকার ভালই ছিল, ভিজতে হত না। (লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে, আমায় দেখাত কেমন? সম্ভবতঃ দূর থেকে লোকেরা দেখত, একটা ছাতা ছোট ছোট পায়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে।) দু-একটা ছুটির দিনে বাসার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের স্রোতে ভাসিয়েছি, না কোন কেয়া পাতার নৌকো নয়, নিতান্তই অপটু হাতে বানানো, কাগজের নৌকো।

উত্তরবঙ্গের দিনগুলোতে বৃষ্টিকে আমি দেখেছি তার আহা-মরি-মরি সৌন্দর্যে, দেখেছি তার ভয়াল-ভয়ংকর-প্রলয়নাচনে। ভাড়া বাড়িতে থাকতাম আমরা। আশে পাশে অনেক বাড়িই ছিল মাটির দেয়াল, টালির ছাদ। আমাদের বাসা ছিল ইঁটের গাঁথুনির পাকা দেয়াল, কিন্তু টিনের চাল (কিংবা অ্যাসবেস্টসের)। দুপাশ থেকে চাল উঁচু হয়ে উঠে গেছে মাঝ বরাবর। দেয়ালের উচ্চতায় চালের নীচে ঘরজোড়া ছাদ। ছাদ আর চালের মাঝখানে হাওয়ার আস্তর শীত-গ্রীষ্মে ঘরের তাপমাত্রা সহ্যের মধ্যে রাখত। কিন্তু সেই হাওয়ার স্তর-ই ধুম বৃষ্টির সময় সৃষ্টি করত – শব্দ। টিনের চালে অতি দ্রুত বড় বড় ফোঁটা পড়ার অবিশ্রাম চড়চড় শব্দ। আমি সহ্য করতে পারতাম না। বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে এক কান তোষকে চাপা রেখে আর এক কান-এর উপর বালিশ চাপা দিয়ে রীতিমত কান্নাকাটি করতাম। আর মা পাশে বসে সমানে গায়ে হাত বুলিয়ে শান্ত করত তার অবুঝ সন্তানকে। ছোট ভাই দুটোর কিন্তু কোন ভয় নেই। তারা দিব্যি ছুটে ছুটে এ জানালা ও জানালা করছে। এখন অবাক হয়ে ভাবি কেন অত ভয় পেতাম আমি? জানি না। তবে এটুকু জানি, আমার ইচ্ছে হলেই যে ঐ অবিরাম আওয়াজ থামিয়ে দিতে পারছিনা সেটাই আমাকে বেশী অস্থির করে ফেলত। ধীরে ধীরে অবশ্য বুঝতে পেরে গেলাম এটাই জীবন। এখন থেকে বেশীর ভাগ সময়ই যা ইচ্ছে করছে তা ঘটবে না। যা ঘটবে তাতে আমার কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আস্তে আস্তে ভয় কেটে গিয়েছিল। বা বলা যায়, ভয়কে সাথে নিয়ে চলতে শিখে গিয়েছিলাম। ভয় কেটে যাওয়ার পর চোখে পড়ল বৃষ্টির অন্য রূপ।

প্রকৃতি একটু একটু করে খুলে দিচ্ছিল তার জাদু-দরজা। ঘরের একদিকের দেয়ালের পাশে ছিল লম্বা লম্বা পাতার কিছু গাছ। তাতে অদ্ভুত দেখতে কিছু কলি। ধীরে ধীরে কলিরা বড় হচ্ছিল। হঠাৎ এক সকালে দেখি, কলি নয়, ফুল। কি অবিশ্বাস্য সুন্দর ফুল! বাবাকে গিয়ে ধরলাম, কি ফুল বাবা?
বাবা বলল, কলাবতী।
এমন ও ফুল হয়, এমন ও নাম হয়! আমার চেতনার কূল ভাসিয়ে বাজতে থাকে কলাবতী, কলাবতী, কলাবতী। তারপর একদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামে। গায়ে সেদিন অল্প অল্প জ্বর।
মা বলে,
– আজ আর দুজনের কারো, স্কুলে গিয়া কাজ নাই।
আমি চাদর মুড়ি দিয়ে হাত-পা ঢেকে বিছানায় বসে থাকি, জানালার পাশে। দেখি, কলাবতী বৃষ্টিতে স্নান করে। পাতার গা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে – টুপ – – টুপ, টুপ টুপ। ফুলের গা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে – টুপ – – টুপ, টুপ টুপ।
ঠাকু’মা এসে পাশে দাঁড়ায়।
– কেমন আছ অহন?
– ভালো।
– জলীয় বাতাস লাগাইও না। জ্বর বাড়ব।
জানালার পাল্লা অনেকটা বন্ধ হয়। একটু ফাঁক রাখা থাকে – নাতির জন্য, কলাবতীর জন্য।
ছোট দু’ ভাই এবার ঘিরে আসে,
– ঠাকুমা গল্প বলো।
ঠাকু’মা বিছানায় উঠে আসে।
বৃষ্টি বাড়ে।
তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলে রাজপুত্রের ঘোড়া, উড়ে চলে। গল্প বলতে বলতেই ঠাকুমা আস্তে করে একটা লেপ বিছিয়ে দ্যায় আমার গায়ের উপর। পাশ ফিরিয়ে দ্যায় আলতো করে। পক্ষীরাজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে উড়ে চলি আমি।
তারপর একদিন হাতে আসে একটা বই, আশ্চর্য বই। ঠাকুমার গল্পগুলো ঝুলি ভরে তুলে দিয়েছেন লেখক। এক বৃষ্টিভেজা, আঁধার হয়ে আসা দুপুরে উপুড় হয়ে পড়তে থাকি –
“কলাবতী রাজকন্যা মেঘ-বরণ কেশ,
তোমার পুত্র পাঠাইও কলাবতীর দেশ।
আনতে পারে মোতির ফুল ঢো-ল-ডগর,
সেই পুত্রের বাঁদী হয়ে আসব তোমার ঘর।”
একসময় বুদ্ধুবানরের ঘরে আসে কলাবতী কন্যা। তার বুদ্ধিতে বুদ্ধুবানর হয়ে ওঠেন বুধকুমার। তখন কি আর জানি, সমস্ত বানরদের বানরছাল পুড়িয়ে মানুষ করে তুলতেই কলাবতীদের এ ধরাধামে আগমন! আর তারপরেও “সেই পুত্রের বাঁদী হয়ে আসব তোমার ঘর।” হায় কলাবতী, হায় নারীজন্ম!

ক্লাসরুমে বসে দেখতাম টিনের চালের উপর দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট উড়ে যাচ্ছে সোজা লাইন ধরে। একটার পর একটা লাইন তৈরী হচ্ছে, হতে হতে দৌড়াচ্ছে, দৌড়াতে দৌড়াতে উড়ে যাচ্ছে। উড়ে যেত আমার মনও। এবং ক্লাসটেস্টের খাতায় উত্তর লেখার মহা মূল্যবান সময়। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মন ভাল হয়ে যেত – সুগন্ধে। পথের ধার ধরে সার দিয়ে মাটিতে পড়ে আছে, কদম ফুল। পরিস্কার দেখে কয়েকটাকে তুলে নিতাম হাতে। প্রস্ফুটিত কদম ফুলে হাত রেখেছি আমি, ছোঁয়া নিয়েছি গালে, চোখে, ঠোঁটে তুলে নিয়েছি তার শিরশিরে কোমলতা। এখন থেকে সমস্ত পরম স্পর্শ মাপা হয়ে চলবে এই ছোঁয়ায় ছোঁয়ায়, চাই বা না চাই।

বাড়ির ভিতর দিকে ছিল পাকা বারান্দা। বৃষ্টির দিনে সেই বারন্দায় উঠে আসত যত রাজ্যের কেঁচো, জোঁক, আরো গুচ্ছের পোকা-মাকড়। জোঁক নিয়ে খুব সতর্ক থাকতে হত। গায়ে বসলে সহজে টের পাওয়া যেত না। গা থেকে জোঁক ছাড়ানোর বা পড়ে থাকা জোঁক মারার জন্য জোঁকের গায়ে নুন ঢেলে দেওয়া হত। একবার মা-এর পায়ের পাতায় একটা জোঁক আটকে ছিল। আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে চিমটি কাটার মত করে জোঁকটা তুলে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। ব্যাস। মা একেবারে আপ্লুত, কি সাহস ছেলের! কতজনকে যে গল্প করেছে! আমিও ধরে নিয়েছিলাম খুব বীরত্বের কাজ হয়েছিল। এখন ভাবি, শ্রোতারা মা-ছেলে দুজনকেই বোধহয় মনে মনে বলত – কি আদিখ্যেতা!

তবে, আমার কাছে খুব ভয়ের ছিল – সাপ। সব সময় নজর রেখে চলাফেরা করতাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জোঁক দেখলেই মেরে ফেলা হত। তা বলে লোকজনেরা কেউ কিন্তু সাপের খবর পাওয়া মাত্রই রে রে করে সাপ মারতে ছুটে আসত না। কত রকম সাপের গল্প যে শুনতাম। বাড়ির ভিতরের উঠানে ছিল ইঁটের পাঁজা। বেশ বড়। মাঝে মাঝে সেখানে, কখনো বা বাড়ির পিছনে ছাইগাদায় বা কলতলা দিয়ে চলে যেত বিভিন্ন রং-এর আর চেহারার সাপ। লতানে গাছের মাচা থেকেও নেমে যেত কখনো কখনো। হুক-কৃমির থেকে বাঁচতে বাড়ির মধ্যে আমাদের চলাফেরা ছিল কাঠের খড়ম পরে। ঘর থেকে বের হবার সময় জোরে জোরে খড়মের আওয়াজ করতাম। সাপেরাও হয়ত অভ্যস্ত ছিল আমাদের চলাফেরায়। কখনো কাউকে ফণা তুলতে বা আমাদের দিকে ছুটে আসতে দেখি নি। আমরা এসে পড়লে সর-সর করে দ্রুত সরে যেত তারা। একবার বেশ চমকে গিয়েছিলাম। বাবা মাঝে মাঝে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় জ্যান্ত মাছ কিনে আনত, কই, মাগুর, শোল। সারা রাত বড় কাঠের পিঁড়ি ঢাকা একটা বালতিতে কলতলায় বা রান্না ঘরে রাখা থাকত তারা। পরদিন মা সেই মাছ কেটেকুটে রান্না করত। সেদিন ভোরবেলা বাথরুমে গিয়েছি, ঘুম-চোখ। দেখি একটা খালি বালতি, বালতির পাশে পিঁড়ি আর বালতি থেকে লাফিয়ে বাইরে এসে পড়ে আছে একটা বড় শোল মাছ। আমি সেটা তোলবার জন্য নীচু হয়ে হাত বাড়ালাম। মাছটা মুহুর্তে যেন শরীরের এক প্রান্ত থেকে ভাঁজ খুলে অতি পরিচিত একটা এঁকেবেঁকে চলা লম্বা শরীর হয়ে গেল। আমি তিন লাফ দিয়ে বাইরে।

এ ছাড়া আরো একটা ভয় ছিল – বান। আমরা ছোটরা এটা বিশেষ বুঝতামনা। বড়ররা খুব-ই উদ্বিগ্ন আলোচনা করত। আমাদের বাড়ির মাইল খানেক কি দুয়েক তফাতে বয়ে যেত তোর্সা নদী। দু’পাড়ে তার মাটির বাঁধ। শীতকালের বিকেলে আমরা আমাদের দিককার বাঁধের উপর হেঁটে বেড়াতাম। শান্ত সুন্দর নদীটি। কিন্তু বর্ষাকালে অন্য কাহিনী। ঐ অঞ্চলে সেই আমলে বিদ্যুৎ ছিলনা। ঘরে ঘরে কেরোসিন তেলের কুপি, হারিকেন, সেজবাতি। সন্ধ্যা পার হলেই রাত আসত ঘন হয়ে। ধীরে ধীরে চারিদিক শান্ত, ছমছমে। আর তখন জানালার পাল্লায় কান রাখলে পরিস্কার শুনতে পাওয়া যেত দূরাগত আওয়াজ। একেক রাতে আওয়াজ বেড়ে যেত। তোর্সা ডাকছে। ডাক ত নয়, গর্জন। মা-বাবা উদ্বিগ্ন মুখে রাস্তার দিকের জানালায় গিয়ে দাঁড়ায়, কান পাতে, পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। রাত্তিরে বাঁধ ভেঙ্গে যাবে না ত? মাঝে মাঝে চারিদিক জলে ভেসে যেত। বাঁধ ভেঙ্গে না উপচে জানি না। হয়ত দুই-ই। সব বাড়িই ছিল একটু উঁচু ভিতের উপর। এই সময় বাড়িগুলো দ্বীপ হয়ে যেত। কলাগাছ কেটে বানানো ভেলায় চড়ে এ বাড়ি ও বাড়ির বড় বড় দাদারা এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় চলে যেত বাঁশের লগি ঠেলে ঠেলে। আমি স্বপ্ন দেখতাম, আমিও একদিন ঐরকম লগি ঠেলে ঠেলে ঘুরে বেড়াব।

স্বপ্ন সফল হয়েছে। লগি-ই ত ঠেলছি। গর্জন বাড়ছে। মোহনা কাছে আসছে।

(এ পর্ব তোমায়, আয়নামতিদিদি)

আগের পর্ব পরের পর্ব