ক্যালিডোস্কোপ – ৩

এইমাত্র আইঅভ্র নামিয়ে নিয়ে চালু করা হয়ে গেল। লিখতে থাকি এখন।

আমার বই-খাতায় অ্যালার্জি। আক্ষরিক অর্থেই। পুরান-নুতন যে কোন বই কয়েক পাতা নাড়াচাড়া করলেই চোখ চুলকান, জল ভরে আসা শুরু হয়ে যায়। এদিকে পড়ার সময় অক্ষররা, সংখ্যারা স্থান পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে একই লাইন ফিরে ফিরে পড়তে হয়। এত ঝকমারি গল্প বই পড়ার জন্য সওয়া যায়, কাজের বই পড়ার জন্য নয়। ওদিকে হাতের লেখা খারাপ এবং লেখার গতি ইচ্ছের সাথে মিলেমিশে চলেনা। ফলে লেখা জট পাকিয়ে যায়। ফলে লেখা-পড়া আমার পক্ষে দিন দিন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল। গিন্নীর হাত ধরে মার্কিন মুলুকে চলে আসার কয়েক সপ্তাহর মধ্যে হাতে এল কম্পিউটার। পড়ার জন্য সিলভার প্ল্যাটার, আজকের ডিভিডির মাতামহী। লেখার জন্য – আদিযুগ চলছে তখন, ডস। আহা! আমায় আর পায় কে, আর কাগজ খুলে হেঁচে কেশে মরতে হবে না! তার পর পেয়ে গেলাম জানালা-৩, দশমিক কত যেন। সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য। আমায় ফেলে বস চলে গেলেন অন্য যায়গায়। নূতন বস সন্ধান দিলেন কোণায় কামড় খাওয়া আপেলের। ওরে না! এ কি জিনিস! দিনে রাতে ম্যাক বাজিয়ে চোস্ত পোস্ট-ডক হয়ে গেলাম। তারপর এল ১৯৯৫। উইন্ডোজ ৯৫ ওয়ালা পি সি। এবং এল নেটস্কেপ। খাড়া লাফ – যুগান্তর ঘটে গেল। কিন্তু এত সবের মধ্যে একটা দুঃখ বাজতে থাকত সর্বদাই। কম্পিউটারে বাংলা লেখা সহজ হচ্ছে না। যা সফটঅয়্যার পাই, কিনে ফেলি, কত যে ডলার গেল, সুবিধা হয় না, লিখে সুখ হয় না।

দিন কাটে, দিনের নিয়মে। হঠাৎ একদিন কতগুলো দুর্বোধ্য শব্দ সংমিশ্রণের সাথে ঠোক্কর খেলাম – ওমিক্রন, ল্যাব, অভ্র, কীবোর্ড! কি আছে জীবনে ভাব নিয়ে নামিয়ে ফেললাম, চালু করে দিলাম। অনুযোগ-অপ্রাপ্তির দিন শেষ হয়ে গেল। জাদুকর-এর নাম দেখলাম মেহদী হাসান। আমরা যারা বাংলায় লেখালেখি করতে ভালবাসি, বিশেষ করে ইন্টারনেট-এ, আমার মনে হয় আমাদের জীবনে পরিষ্কার দুটি অধ্যায় – অভ্র ব্যবহার করতে শুরু করার আগে এবং পরে, ভাষা উন্মুক্ত হওয়ার আগে এবং পরে।

বেশ চলে যাচ্ছিল। ধাক্কা খেলাম বছর দেড়েক আগে। পি সি ছেড়ে ম্যাকে ফিরেছি, অভ্র নেই। পাগল পাগল লাগতে রইল। খোঁজ নিয়ে দেখি বাংলাদেশের আর এক জাদুকর এস, এম, রাইয়ান কবির উপায় করে রেখেছেন – অঙ্কুর। আঃ, প্রাণ বাঁচল! অনেক ধন্যবাদ জনাব রাইয়ান কবির!

আজ থেকে অবশ্য আবার ফিরে এলাম অভ্রতে। আবারো ধন্যবাদ মেহদী আর তার দলকে।

এদিকে অন্যান্য কিছু কাণ্ড ঘটে চলেছিল। ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে জোর আদিখ্যেতা চালু করে দিয়েছিলাম। ছবি তুলে যাচ্ছিলাম চুটিয়ে। কিন্তু লোকজনকে দেখাতে না পারলে কিসের কি! ঢুকে গেলাম ফ্লিকার জগতে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম এ বিদ্যের লোক আমি নই। আমার সে বোধ নেই, ধৈর্য্য ও নেই। তবে, একটা বিশেষ লাভ হল। কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হল, ভাই-বোন-দাদা-দিদি-বন্ধু , বেশীই বাংলাদেশের তাঁরা, বাকি পৃথিবীর-ও আছেন, সারা পৃথিবী জুড়েই বাস তাঁদের। মুগ্ধ হলাম, এত গুণী ও হয়, এত আপন, আপ্লুত হলাম। সেখানে ডাক্তার ফটোগ্রাফার বন্ধু আফতাব-এর সূত্র ধরে এক আড্ডায় হঠাৎ দেখি এক পরিচিত নাম – ডাঃ মেহেদী হাসান খান। অত্যন্ত প্রিয় এবং সম্মানিত মানুষ সে। আরো গভীর ভাবে সেখানে চিনলাম তাকে।

এদিকে ফ্লিকার থেকে আস্তে আস্তে সরে আসছি। প্রিয় বন্ধুদের পোস্টে মাঝে মঝে যাই, একটা-দুটো মন্তব্য রেখে আসি। এমনি এক দিন, প্রিয় বন্ধু সাজন-এর এক ছবিতে মন্তব্যর জন্য ইন্টারনেটে জীবনানন্দর কবিতা খুঁজতে খুঁজতে এসে হাজির হলাম এক আশ্চর্য পোস্ট -এ। পোস্ট দিয়েছেন তারেক অণু। ছবিব্লগ। জীবনানন্দর কবিতার সাথে। স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম।

ফ্লিকার-এ থাকার দিনগুলোতে আমার একটা উদ্ভুটে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, কোন ছবি ভাল লাগলে সেই ভাল লাগা থেকে একটা কবিতা বা কবিতার মত কিছু লিখে ফেলা। তারেক অণুর এই পোস্ট দেখেও লিখে ফেললাম একটি কবিতা। কিন্তু সেটা আর মন্তব্যের ঘরে বসাতে পারি না। শেষে সাজনই আমার নাম উল্লেখ করে পোস্ট করে দিল। এদিকে ওই পোস্ট-এ আকৃষ্ট হয়ে আমি গোটা সাইট-টিই একটু ভাল করে দেখতে শুরু করলাম। আর চমকে গেলাম। মেহদী। ডাঃ মেহদী হাসান খান। এক আশ্চর্য ছবিব্লগ পোস্ট করেছে। প্রজন্মবার্তা, শাহবাগ। মেহদী যেখানে এমন পোষ্ট দেয়, সে জায়গাকে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারি। কি সাইট এটি? সচলায়তন।

পরদিন পরম আবেগে ঘুরে বেড়ালাম সাইট জুড়ে। মনে হল এরই সন্ধানে ছিলাম আমি। তারপর ক’টা দিন মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়ালাম সাইট জুড়ে। শেষে এক দিন আর দেরী না করে নিবন্ধন সেরে ফেললাম। এর পরে পরেই একদিন যে লেখা পড়ে মন্তব্য করলাম সে লেখা আর আমাকে সচলায়তন থেকে দূরে থাকতে দিলনা। জোহরা-দিদির মায়াঝরা লেখা থেকে শুরু করে সেই যে বকবক করতে শুরু করলাম, আর থামা হল না।

তারেক অণুর পাখির নামকরণ নিয়ে লেখায় মন্তব্য করতে গিয়ে আবার এক নূতন অভিজ্ঞতা হল। মুর্শেদ-ভাইয়ের বাংলা ওয়েব টুলস। অসাধারণ কাজ। ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই।

ভেবেছিলাম মন্তব্য করেই চালিয়ে যেতে পারব। সেটাও হল না। আয়নামতিদিদি এমন তাড়া লাগাল যে, যা থাকে কপালে বলে একটা অনুবাদ নামিয়ে বসলাম। অবধারিত ভাবেই ফেল্টু কাজ হল। কিন্তু, সাক্ষী-মশাই, নজরুল-ভাই, পাণ্ডব-দা, মর্ম, প্রোফেসর সাহেব, জনাব আব্দুল্লাহ, আশালতা-দি, আর বায়নামতিদি ত বটেনই সবাই হাল না ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়ে বসলেন। ফলে, ইতিমধ্যেই ব্লগ পাতার ক্রমিক সংখ্যা ৩-এ ঢুকে গেছে। ঈশপের গল্প সিরিজে অণুগল্পগুলির সংখ্যা ৮০-তে পৌঁছে গেছে। বিশ্বাস হতে চায় না!

এবার একটা মজার কথা দিয়ে আজকের পর্ব গুটিয়ে আনি। ছোটবেলায় নানা লোক নানা স্বপ্ন দেখে। বয়স বাড়ে, স্বপ্নরা কমে যায়, মিলিয়ে যায়, আসেনা বিশেষ আর – নূতন করে। মাঝে মাঝে একটা-দুটো। সচলায়তনে লেখা শুরু করে আমি একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম, একদিন পোস্টে একটা মন্তব্য আসবে, বিশেষ একটা, আমার ই-মেল চেক করতে বলে। আসতে দেখেছি কারো কারো। কিন্তু আমার আর সে স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। ঘন ঘন ই-মেল চেক করার অভ্যাস আমার। ফলে সেই মন্তব্যটা আর আসার সুযোগ-ই পায় নি। বিনা মন্তব্যেই একদিন জানতে পেরে গেছিলাম প্রিয় সচলায়তনে একটি পাতায় এবার লেখা হবে

সচল হলেন:
March 22, 2013

কিন্তু এসেছিলাম ২০ ফেব্রুয়ারী। পরের দু’দিন কেটে গিয়েছিল এক অপূর্ব উন্মোচনে। বর্ষপূর্তির অনেক ভালোবাসা সচলায়তন!

আগের পর্ব পরের পর্ব