ক্যালিডোস্কোপ – ৪

খেলনাটা নিয়ে খেলবার সময়, মনে আছে, ঘোরাতাম একটু একটু করে। এক সময় ফিরে যেতাম আগের অবস্থানে। কিন্তু পুরানো ছবি আর ফিরত না। জীবনের ক্যালিডোস্কোপেও ফেরে না। আমার সে উত্তরবঙ্গের দিনগুলোও ফিরবে না আর। স্মৃতির সরণীতে শুধু মাঝে মাঝে দেখতে পেয়ে যাই তাদের, আচমকাই, কখনো ঝাপসা, কখনো উজ্বল – যেন কাল-ই ঘটেছিল তারা।

আমাদের পাশের বাড়িতে একটি চমৎকার কুল গাছ ছিল। দুই বাড়ির মাঝে যে বেড়া ছিল, বাড়ির বাচ্চাদের সুকীর্তির ফলে মাঝে মাঝেই সেটার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা বলে কিছু থাকত না। একদিন বেড়ার ফাঁক গলে ওপারে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফলভরা কুল গাছ। গাছের সামনে মানুষ-জন। আমায় যে প্রশ্ন করা হল আমি তার অর্থ বুঝলেও নিশ্চিত হতে পারলাম না, চুপ করে থাকলাম। তারা আর আমায় বিব্রত না করে আঁজলা ভরে কুল দিয়ে দিল। আমি বাড়ি ফিরে এসে ঠাকুমার কাছে হাজির হতেই ঠাকুমা বলল
– হাতে কি আনছ, কুল?
– মনে ত হয়। কিন্তু, ওরা বলল বড়ই।
ঠাকুমা একগাল হেসে বলল,
– একঅই কথা।
বুঝতে পারলাম না ‘বড়ই’ শব্দটা ঠাকুমার আগেই জানা ছিল কি না। নাকি প্রতিবেশীদের সাথে গপ্পো-গাছা করার সময় জেনে নিয়েছিল। কিন্তু আমি শব্দটা শিখে গেলাম।

আস্তে আস্তে এই রকমের অনেক শব্দের সাথে পরিচয় ঘটে গিয়েছিল যাদের অনেককেই আজ আর মনে পড়ে না। উত্তরবঙ্গ ছেড়ে আসার পর এরা হারিয়ে গিয়েছিল আমাদের জীবনচর্যা থেকে। সম্প্রতি জনাব আব্দুল্লাহ এ.এম.-এর পোস্ট “আমাদের ভোটবর্মী ঋণ”-এ এই শব্দদের অনেককেই আবার ফিরে পেলাম। অনেক কৃতজ্ঞতা তাঁকে। এই লেখাটির মধ্যে কোচদের থেকে আসা শব্দগুলিকে পড়ে মনে হয়েছিল পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হয়ে গেল।

ঠাকুমাও হয়ত এই উত্তরবঙ্গের জীবনে ফিরে পেয়েছিলেন পুরনো বন্ধুকে, তাঁর আবাল্য পরিচিত ভাষাকে। বহুকাল বাদে তিনি যেন কথা বলার স্ফুর্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। এমনিতে আমার বাবা এবং ঠাকুমা বেশী কথা বলার মানুষ ছিলেন না। কিন্তু কোচবিহার বসবাসের ঐ তিন বছরে ঠাকুমাকে তার চারপাশের মানুষদের সাথে অনেক বেশী গল্প করতে দেখেছি। এমন হতে পারে যে সেখানে তিনি বেশ কিছু মানুষ পেয়েছিলেন যাঁদের সাথে তাঁর প্রাক-উদ্বাস্তুজীবনের মানুষদের জীবনচর্যার নানা মিল ছিল। আত্মীয়তার একটা টান অনুভব করেছিলেন তিনি। আর সেই টানের মধ্যে ভাষার টান-ও হয়ত একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

টান এক মজার অনুভূতি। যে তিন বছর উত্তরবঙ্গে ছিলাম, দিন-রাত ভাবতাম কবে ঘরে ফিরব। ঘর মানে কোচবিহার যাওয়ার আগে দক্ষিণবঙ্গের একটি শহরে যে বাড়িটিতে আমরা ভাড়া থাকতাম সেই ভাড়াবাড়িটি। আর উত্তরবঙ্গ ছেড়ে আসার কয়েকবছর পর থেকে কি যে এক চোরাটান ছেয়ে থেকে অস্তিত্ব জুড়ে – সেই তোর্সাতীর-এর জন্য!

অরণ্যষষ্ঠীর সকালে মা, আরো প্রতিবেশী কাকি-পিসী-মাসীরা দলবেঁধে নাইতে যেত তোর্সা নদীতে। সাথে নূতন কেনা তালপাতার পাখা, নানা রকম গোটা ফল, দুর্বা। আমি আর মেজভাইও যেতাম সাথে। আমরা জলে নামতাম না। মা-মাসীরা সবাই নামত। স্মৃতিজলে নানা ছবি থেকে থেকে ভেসে যায়, খুঁটিনাটি ডুবে যায় হামেশাই। তাই নিশ্চিত করে বলবার দাবি নেই কোন। কেউ কেউ স্নান করার সময়, না কি স্নান শেষে, গোটা আম, হয়ত অন্য ফলও, ছুঁড়ে দিত তোর্সার জলে। আমাদের-ই বয়সী কিছু দামাল ছেলে যারা ঐ সময় সর্বক্ষণ জলেই রয়েছে, ঝাঁপিয়ে ডুব দিয়ে তুলে নিত সেই সব ফল। নদীর সন্তান তারা, নদীতে উৎসর্গের ফলে তাদেরই অধিকার।

স্নান সেরে ঘরে ফিরে মা এক এক করে, সার বেঁধে দাঁড়ান আমাদের তিন ভাই কে ভেজা পাখা দিয়ে বাতাস করে দিত। সে পাখা ধরারও রীতি ছিল। ডাঁটিতে ধরা নয়। পাখা যেন থালা, তাতে ধান, দুর্বা আর গোটা গোটা ফলেরা বসে আছে। মা এক হাতে আঙ্গুলের চাপে সেই ঢেউখেলানো থালাকে ধারণ করে আছেন নীচে থেকে, আরেক হাত রেখেছেন ফলেদের উপরে যাতে তারা গড়িয়ে না যায়। তারপর সেই থালা উঠছে, নামছে, উঠছে, নামছে, আর বারি-বিন্দু-সিঞ্চিত আশীর্বাদী বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে আমার শরীরে, মননে, শুদ্ধ হয়ে উঠছি আমি, পূর্ণ হয়ে উঠছি। এই ছবি কি ঠিক এই রকম-ই ছিল? কি এসে যায়! আমার মনে এ ছবি এ ভাবেই আঁকা আছে। সকল আশীর্বাদ-এ আমাদের ভুবন ভরিয়ে দিয়ে জীবন নদীর পাড়ে বসে আছেন মা এখন, ডাক এসে যাবে যে কোন দিন। আমার কোন ঈশ্বর নেই, কোন প্রার্থনা নেই। শুধু আকাঙ্ক্ষা আছে, মা’র হাতের ঐ ঠান্ডা বাতাস যেন আমায় ঘিরে রাখে, যতদিন আমার স্মৃতি থাকে, যতদিন চেতনা থাকে।

তোমার ছেলে ফুলুস হবে মা। ফুলুস মানে পুলিশ। এই ছিল সে নাচুনীর কাছে মানুষের সর্বোচ্চ সাফল্যের জন্য আকাঙ্খার রূপ। কিছুদিন বাদ দিয়ে দিয়ে আসত সে। এসেই মাকে ডাকাডাকি শুরু করে দিত। মা এসে দরজা ধরে দাঁড়াত। আমরা ভাইয়েরা মা’র পাশ ঘেঁষে। তারপর ঘুরে ঘুরে নাচ দেখাত সে। তার চেহারায়, সাজ-পোষাকে অন্যরকম কিছু ছিল। তার নাচও ছিল এমন কিছু রকম যা আগে কখনো দেখিনি, অবশ্য কতটুকুই বা এ দুনিয়ার দেখেছি তখন, পরেও দেখার সুযোগ ঘটেনি। এই লেখা লিখতে বসে মনে হল প্রযুক্তির সাহায্য নিলে কেমন হয়! ইউটিউবে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে একসময় পেয়ে গেলাম সেই নাচের ধারার দেখা। রাজবংশী। সে মেয়ে কি তবে নাচত সাইটোল নাচ, আমাদের জন্য ষষ্ঠী ঠাকরুণ কি মনসা দেবীর আশীর্বাদ আবাহন করে? নাচ শেষে মার কাছ থেকে কিছু পেয়ে বারে বারে দু’হাত তুলে সে প্রার্থনা জানাত তার ঈশ্বরের কাছে মা’র সন্তানদের সাফল্য কামনা করে। কিন্তু কেন সে পুলিশকেই জানত সর্বোচ্চ ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু হিসেবে? পুলিশ কি তাদের জীবনে ছিল কোন ভয়ানক নিয়ন্তার ভূমিকায়, তাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত নিয়ামক? হয়ত সমাজ তখনো অনেক সরল ছিল, ক্ষমতার আরো আধুনিক দাবীদার-রা হাজির হয়নি তখনো।

তাঁর কাজে তাঁর জেলার উচ্চ আধিকারিক হিসাবে উত্তরবঙ্গের সেই দিনগুলোতে বাবার জীবন অনেক জটীলতার আবর্তে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা তিন ভাই মহা আনন্দে মিশে গিয়েছিলাম সেই না-শহর-না-গ্রাম-এর সহজ জীবনে। কলার ঝাড় কি কচুর বন কি ছাইয়ের গাদা – টপকে টপকে আমরা চলে যেতাম পাড়ার এ মাথা থেকে ও মাথা , এ বাড়ি ও বাড়ির উঠান পেরিয়ে। কোন উঠানে ধানের মরাই, ধান মাড়ানোর ঢেঁকি, আচার শুকাচ্ছে কোথাও, লম্বা কাপড়ের টুকরাতে বড়ি। কোন উঠানে শসার মাচা, কারো ঘরের টালির চালে পুরুষ্টু লাউয়ের ভরা সংসার, কারো ঘরের পাশটিতে সর্ষে গাছের ফুলে হলুদের ঢেউ খেলে যাচ্ছে।

নিজের হাতে, নিজের বাড়িতে ফুল ফোটানো, ফল ফলানোর আবহে আমাদের বাসার উঠানেও কত কি যে হত! কোথাও নরম হলুদ রং-এর অতসী ফুল। আবার কোথাও ফুটে আছে নীল অপরাজিতা কি লাল রং-এর জবা। আর, গাঁদা ফুল-এর দিনে বারান্দার ধার ধরে ধরে উঠান জুড়ে রকমারী গাঁদাফুলের সমারোহে ত রং-এর বন্যা বইত! কখনো কোন এলাকায় ছোট ছোট, সর্বদা আকাশমুখী চকচকে কাঁচা লংকা, কখনো আবার কোথাও ধনে শাক, সর্ষে। লম্বা লম্বা ঢেঁড়স গাছে কচি কচি ঢেঁড়স। পেঁয়াজকলি এসেছে কোথাও। বিশেষ যত্ন নেওয়া জমিতে লাউ কি কুমড়োর বীজ থেকে গাছ বের হয়ে এসেছে। সে যে কি উত্তেজনার ঘটনা! তারপর সে গাছ যত্ন করে বড় করা। একসময় তাকে এগিয়ে দেওয়া রান্না ঘরের চালে। যাও সোনা, এবার ছড়িয়ে পড়ো মনের আনন্দে। তারপর তাতে ফল ধরে। ফল কাটা হয়, রান্না হয়। কি স্বাদ তার! এ বাড়ির লাউ ও বাড়ি যায়। ও বাড়ির কুমড়ো এ বাড়ি আসে। কোন একটা কি দুটো ফল আবার পাকানো হয় পুরোপুরি যাতে তার থেকে পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় বীজ – পরের ঋতুর জন্য। দু’বাড়ির বেড়ার গায়ে বইছে সীমের লতা, প্রতিবেশীর লাগানো, বইছে দু’পাশেই। ও পাশের ফল তাদের, এ পাশের ফল আমাদের।

প্রথম অঘ্রাণের প্রথম রবিবার সন্ধ্যায় আমাদের পাশের বাড়ির উঠানে গিয়ে জড় হয়েছি। উঠানের মাঝখানে পূজার আয়োজন, নাটাই ব্রত। মেয়েরাই আয়োজক। এ বাড়ি ও বাড়ির কাকি, পিসী, মাসীমারা আর, আমরা – কুচোকাচারা। ব্রতকথা পড়া শুরু হত একসময়। চুপ করে শুনত সবাই। কি ছিল গল্প, এখন মনে পড়ে না। সম্ভবতঃ ফসলের কি জমির দেবতার অনুগ্রহ প্রার্থনা করে কোন গ্রামীণ লোককথা। ভারী মজার এক খাবার ছিল সে পূজার প্রসাদ-এ। ছোট ছোট পিঠা, চালের। নুন দেওয়া এবং নুন না দেওয়া। পরের রবিবারে আবার ব্রতকথায় হাজির। আজ অন্য ব্রত, সম্ভবতঃ সত্যনারায়ণের। গোটা অঘ্রাণ মাস জুড়ে প্রত্যেক রবিবারে পাল্টে পাল্টে নাটাই আর সত্যনারায়ণ। উত্তরবঙ্গ ছেড়ে আসার পর সত্যনারায়ণের দেখা মিললেও নাটাই ব্রতকথার আর দেখা মেলেনি।

পৌষের সংক্রান্তির দিনটিতে যে উৎসব চরমে উঠত সারা শীত ধরেই চলত তার প্রবাহ – পিঠা আর পায়েস, কত যে রকমের – স্বাদ আর সুবাসের! এমনি রান্না হত বালতি কেটে বানানো উনান-এ। পিঠা পায়েস হত বিশেষ উনানে। বাবার নিজের হাতে বানান। নৌকার মত দেখতে সে উনানের মাঝখানটা উঁচু, মাটির ছইয়ের মত। ছই-এর দু’পাশে উনানের দুই মুখ। কাঠের আঁচে রান্না। মাটির সরায় বানান হত চিতই পিঠা। মাটির, লোহার কি পিতলের কড়াইতে কুলি পিঠা, পাটিসাপটা। নারকেলের নাড়ু, সাজ, তক্তি, চিরাজিরা। তিলের নাড়ু, তক্তি – নানা আকৃতির। খেজুড় গুড়ের পায়েস। নাড়ু, তক্তি, চষি, কি পিঠের পুর বানানোর যজ্ঞে মা-ঠাকুমার সাথে আমিও জুড়ে যেতাম। সেটা ছিল বাড়তি মজা – পরবর্তীতে দোকান থেকে কিনে আনা খাবারের রমরমার দিনগুলোতে যেটা অনেক কমে গিয়েছিল। সব বাড়িতেই প্রায় একই খাবার বানান হত কিন্তু প্রত্যেক বাড়ির পিঠা-পায়েসের স্বাদ ছিল আলাদা, আলাদা! সবই ভাল লাগত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অনেক রকমের খাদ্য হত ঠিক-ই কিন্তু সমস্ত খাবারের সরবরাহ-ই ছিল নিয়ন্ত্রিত। বহু বছর পার করে এখন-ও বাড়িতে পাটিসাপটা বানান হয়, গিন্নীর চমৎকার কারিগরী। বন্ধুবাড়িতে রকমারী পিঠের সমাহার – সুচারু, দক্ষ শিল্পের নিদর্শন। বড় তফাৎ দেখি – সমস্তই অঢেল, যথেচ্ছ পরিমাণ। আর কে জানে, সরবরাহের সীমাবদ্ধতার সেই অভাবের অভাবেই হয়ত বা, স্মৃতিতে সংরক্ষিত সুস্বাদের কাছে কিছুতেই আজ আর আমি পৌঁছাতে পারি না!

আগের পর্ব পরের পর্ব