ক্যালিডোস্কোপ – ৭

উত্তরবঙ্গে ছিলাম মাত্র তিনটি বছর, প্রায় ছয় দশকের এই জীবনের তুলনায় কতটুকু আর তা! অথচ সেই দিনগুলির কত যে ছবি স্তরে স্তরে রাখা আছে স্মৃতির কোষে কোষে! কোষগুলি ধূসর নিশ্চয়ই, আমার সে স্মৃতিগুলি আজো ধূসর নয়, ক্যালিডোস্কোপের নড়াচড়ায় দিব্যি উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠে।

বাড়ির এক মিনিটের দূরত্বে ছিল বড় রাস্তা, ক্যাঁচর-কোঁচর গরুর গাড়ি থেকে লজ্ঝড়ে লরি, বিশাল ট্রাক, সারি সারি ট্যাঙ্ক – সব যেত ঐ রাস্তা দিয়েই! মাঝে মাঝে ফৌজী বাহিনী দৌড়ে যেত কুচকাওয়াজ করতে করতে। সে সময় পাড়ার সব বাড়ির আমার বয়সী ছেলে মেয়েরা ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়ে যেতাম রাস্তার ধার ধরে। এক দিন অন্যরকম কিছু আওয়াজ শুনে বড় রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার চেনা বাচ্চারা সব এর মধ্যেই এসে গিয়েছিল। যা দেখলাম তা আগে কখনো দেখি নি। অনেক মানুষ একসঙ্গে চলেছে। মাঝখানে কয়েকজনে মিলে বয়ে নিয়ে চলেছে একটা রঙ্গীন কাঠামো। মানুষ চলেছে কাঁদতে কাঁদতে, আর্তনাদ করছে তারা। একসময় বাড়ি ফিরে বললাম কি দেখে এসেছি। বাবা বাড়ি ছিল। বলল যে এ ছিল মহরমের মিছিল।
– মিছিল কাকে বলে?
– যা দেখলে, অনেক মানুষ একসাথে ঐ ভাবে গেলে তাকে মিছিল বলে।
– সবাই কাঁদছিল কেন? সবাই বলছিল হায় হাসান, হায় হোসেন। কেন?
– দুঃখ হচ্ছিল যে সবার। হাসানের জন্য, হোসেনের জন্য। অনেকদিন আগে বড় করুণ ঘটেছিল তাঁদের ঘিরে। সেই ঘটনা স্মরণ করেই মুসলমানরা ঐ মিছিল করেন। সব মুসলমানরা না, কেউ কেউ।
– মুসলমান মানে? মুসলমান কাদের বলে?
– যারা ইসলাম ধর্ম পালন করেন তাদের মুসলমান বলা হয়।
এরপর বাবা বলল কারবালার প্রান্তরের কাহিনী। তৃষ্ণাকাতর শিশুর মৃত্যু ঘটানোর নৃশংসতার কথা বলার সময় চোখ মুছল। চুপ করে বসে রইল একটু। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একসময় বলল,
– এখনো সব বোঝার বয়স হয়নি তোমার, বড় হলে আস্তে আস্তে অনেক কিছু বুঝতে পারবে।

তারপর একটি বইয়ের নাম বলল। অনেকদিন বাদে বইটি পেয়েছিলাম এক সন্ধ্যায়, কারো বাড়ি বেড়াতে গিয়ে। সময় কম। অল্পই পড়ে উঠতে পারলাম। অন্যরকম লেখা। সমুদ্র তরঙ্গের মতই ঘটনাপ্রবাহ আছড়ে পড়ছে, ফিরে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে প্রবল ঘনঘটায়। এবং সে সমুদ্র চূড়ান্ত বিষাদময়। দমবন্ধ করে ফেলে একেক সময়। পরে বিভিন্ন দিনে, একাধিকবারের চেষ্টায় সমাপ্ত করতে পেরেছিলাম সে বইয়ের পাঠ। সময়ের সমুদ্র পার হয়ে সে কাহিনীর বিপুল বিস্তার এখন আর মনে করতে পারি না সে’ভাবে। শুধু সেই প্রথম সন্ধ্যার মৃদু আলোয়, মাত্রই কয়েকটি পাতা, মীর মশাররফ হোসেন-এর বিষাদ-সিন্ধু পড়ার অভিজ্ঞতা, আজো বুকের ভিতর মুচড়ে নেয়। থেকে থেকে টের পাই, কোন না কোন বিষাদ-সিন্ধু ঘিরেই থাকে আমাদের, অন্তহীন। থেকে থেকে স্তব্ধ হয়ে ভাবি, বুঝি না, আজো বুঝিনা, কিভাবে কারবালার সে মর্মান্তিক প্রান্তর ফিরে ফিরে আসে, ফিরে ফিরে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় সমাজ-সংসার!

বাবা ভালবাসত গুছিয়ে কথা বলতে। যেভাবে যত্ন করে জামা কাপড় ইস্ত্রী করে সাজিয়ে রাখত, কথাও বলত তেমনি করে। পদ্মাপারের বাচনরীতি প্রবলভাবেই হাজির থাকত তার কথায়। বাড়িতে টেপ-রেকর্ডার ঢোকার পর নিজের অজান্তে ফিতে-বন্দী হয়ে যাওয়া ‘বাঙাল ভাষায়’ বলা নিজেরই কথা শুনে আমাদের প্রশ্ন করেছিল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন নুতন রেকর্ড কিনেছি কিনা আমরা। তার কথায় চলিত শব্দের পাশাপাশি সাধুভাষার শব্দরাও থাকত অনেকই। বড় হয়েছিল সাধুভাষায় লেখা বই পড়ে। হ’তে পারে সে কারণেই। বেশী কথা বলত না বাবা। কিন্তু তার সাধ্যমত আমার মাথায় বিভিন্ন সময় ভরে দিয়েছিল নানা গল্প, ইতিহাস, চিন্তা, দর্শন, জীবনের অভিজ্ঞতা। নিজের আত্ম-পরিজন-বন্ধুদের কথা খুব একটা বলত না। শৈশবে পিতৃহারা মানুষটির মনে হয়ত কোন অভিমান কাজ করত।

বাবার কাছে অসম্ভব বেদনার ছিল এই পৃথিবীতে তার প্রিয়তম ভূখন্ড, তার জন্মভূমিতে ফিরতে না পারা। তবে একেক সময় মনে হত সবচেয়ে কষ্টের ছিল দেশভাগের ফলে সে ভূখন্ডের যে নাম জুটেছিল, প্রিয় জন্মভূমিকে সেই নামে চিহ্নিতকরণ! সেই নামটার উচ্চারণ। বাবা কোনদিন ভাবতে পারেনি যে ঐ নামের দেশটির একটি অংশ হয়ে যাবে তার জন্মভূমি। ঐ দেশটির উদ্ভব তার কাছে ছিল বৃটীশদের শয়তানী, উচ্চ ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণকারী কিছু মানুষের মর্মান্তিক ভুল আর কিছু মানুষের নৃশংস ক্ষমতালিপ্সার ফল। কিন্তু বাংলার সাহসী মানুষেরা যে সে ভয়ানক বীভৎসায় সামিল হয়ে গেল, তাকে আটকাতে পারলনা এটাই বাবাকে অত্যন্ত ম্লান করে দিত। বহুদিন বাদে বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভ তাকে সে মালিন্য থেকে, অন্তর্লীন বিষণ্ণতার কুয়াশা থেকে বার করে এনেছিল। হয়ত বাবার মনে আশাও হয়েছিল, ঘুরে আসতে পারবে বাংলাদেশ থেকে। পরে, কোন এক ১৫ই আগস্ট এসে সেই উত্তরণ, সেই আশা তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল – বরাবরের মত। আবার কুয়াশা কাটার দিনগুলি দেখার সৌভাগ্য আর হয়নি বাবার। দেখা হয়নি যে নিজে না পারলেও তার নাটক-নিয়ে-মেতে-থাকা ছোট ছেলে বাংলাদেশের মানুষের আমন্ত্রণে ঘুরে এসেছে সে দেশ থেকে, প্রচুর ভালোবাসা সাথে করে।

জন্মভূমি হারিয়ে ‘রিফিউজি’ হয়ে যাওয়ার জন্য বাবা ইংরেজকে যতটা দোষ দিত, মা ততটা দিত না। মা বলত
– ইংরেজ ত তার কাজ করবেই, কিন্তু আমরা কি করলাম, আমরা, ভারতবর্ষের মানুষেরা, বাংলার মানুষেরা? ছিঃ ছিঃ!
মা’র সাথে আমার অনেক গল্প হ’ত। কুচবিহারের সেই দিনগুলি থেকেই আমার চেয়ে প্রায় পঁচিশ বছরের বড় এই মেয়েটির সাথে ঘটেছিল আমার প্রবল বন্ধুত্ব। মাঝে মাঝে চৌকিতে, মার কোলে মাথা রেখে বলতাম,
– মা ঐ গানটা গাও।
– কোনটা?
– প্রণাম তোমায় ঘনশ্যাম।
চৌকির পাশে মেঝেয় বসে কিছু একটা নিয়ে খেলা করছে ছোট দুই ভাই, বাবা ফেরেনি এখনো। ঠাকু’মা জপের মালা হাতে নিয়ে ভিতর বারান্দায় পায়চারী করছে। সদ্য গা-ধুয়ে আসা মা’র গায়ে পন্ডস্ ক্রীম-এর মন কেমন করা সুবাস। বাইরে বিকেলের আলো, নিভু-নিভু হয়ে এসেছে। মা গেয়ে চলেছে – প্রণাম তোমায় ঘনশ্যাম, তোমার চরণ স্মরণ করি, বিদায় এবার নেব হরি …। সাথে আমিও মাঝে মাঝে গলা মেলাচ্ছি।

সেই দিনগুলির পরে প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার করে এ মানুষটার এখন সেই সব সন্ধ্যাগুলোর কথা মনে হলে মৃদু হাসির সাথে একটা অদ্ভুত মায়া জাগে। একজন নিতান্তই শিশু আর এক দীপ্ত তরুণী হরির চরণে স্থান নেয়ার জন্য আকুল হয়ে গেয়ে চলেছে। আসলে তারা দু’জনে দু’জনের কাছে স্থান করে নিচ্ছে। নিজের কাজে মেতে বাবা সেই সময় একটু একটু করে মা’র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সেই শুরু। আর আমি বাবার বদলীর চাকরীর কারণে চারপাশের চেনা জগৎ থেকে উৎখাত হয়ে উত্তরবঙ্গের অচেনা পরিবেশে গিয়ে মা’কেই আঁকড়ে ধরতে শুরু করেছি। আমরা তিন ভাই জন্মেছিলাম প্রায় পিঠোপিঠি। মা’কে তেমন করে কবে কাছে পেয়েছি, উত্তরবঙ্গের দিনগুলির আগে, মনে পড়ে না। ফলে ঐ সময়ে দু’জনের চেনা-জানা হচ্ছে নুতন করে। তারপর কেটে গেল কতযুগ। সেই মানুষ-দু’জন আজ প্রায় দুই ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। ভাগ্যিস দূরভাষ আছে!
– হ্যালো, মা?
– কে, …?
– হ্যাঁ, আমি …।
– বল বাবা, কেমন আছ তুমি, সব ঠিক আছে ত?
বলতে পারি না, কেমন করে সব ঠিক থাকবে! আমার আর কোনদিন সব ঠিক থাকবে না, মা!

হয়ত এ লেখা উচিত ছিল মাতৃদিবসে, হয়ত উচিত হত পিতৃদিবসে। বাবা চলে যাওয়ার পর কোন আনুষ্ঠানিক আচরণ পালন করি নি আমি। মা চলে যাবে যে কোন দিন, তখনো করব না। বছরের কোন নির্দিষ্ট দিনে তাদের মনে করার মত সুশৃঙ্খল মননও নেই আমার। আউলা-ঝাউলা ভুলো-মন, যখন যেমন পারি মনে করি, কথা বলে চলি তাদের সাথে।

আগের পর্ব পরের পর্ব