ক্যালিডোস্কোপ – ৯

ক্যালিডোস্কোপ ঘুরছে। একই উপাদানগুলি নিয়ে গড়ে উঠছে নানা ছবি। কাকে ছেড়ে কার কথা লিখি! এদিকে, উপাদান ত অতি সামান্য, গড়পড়তা বালকের গড়পড়তা জীবনের টুকিটাকি। অবশ্য, সামান্য উপাদানে কি আর অসামান্য কাজ হয় না! হয় বৈকি! অসামান্য মানুষেরা করেন সে সব। এ ছবিগুলি সে’রকম নয়, নিতান্তই সামান্য, তুচ্ছাতি তুচ্ছ! ইতিহাস ত নয়ই, কোন গল্প বই হিসেবে পাঠযোগ্যতারও দাবীদার নয়, আদৌ কোন পাঠযোগ্যতা আছে কি না তাতেও দ্বিধান্বিত হয়ে আছি। তাহ’লে কেন আর পাঠকের সময় নষ্ট করা! হয়ত পাঠক বেঁচে যাবেন মডারেটরদের অক্লান্ত প্রয়াসে। যদি না যান, জানিয়ে রাখি, তাদের বেদনাকে আরও প্রলম্বিত না করাতে চাইলে, নির্দ্বিধায় আওয়াজ দিতে পারেন, ক্যালিডোস্কোপ যে কুলুঙ্গী থেকে নেমে এসেছিল, সেখানেই তাকে ফেরৎ পাঠিয়ে দেব।

কলকাতাকেন্দ্রিক দক্ষিণবঙ্গের দিনগুলির তুলনায় উত্তরবঙ্গের দিনগুলি ছিল অনেক বেশী গ্রামীণ, মফস্বলী। কিন্তু, নিউ টাউন, কুচবিহার-এর সেই জীবন প্রবাহও ছিলো রীতিমত আধুনিক ও শহুরে – গ্রাম কুচবিহার-এর তুলনায়। গ্রাম কুচবিহার-এর দেখা পেয়েছিলাম একবারই, অতি সামান্য সময়ের জন্য। গিয়েছিলাম এক পিসীর বিয়েতে হাজির থাকতে। পিসী লেখাপড়া শিখেছিলেন। কিছুদিন আমাদের বাড়িতে বেড়িয়ে গিয়েছেন। তবে তার নিজের বসতটি ছিল এক নদীর ধারে, আমাদের শহরটি থেকে খানিকটা দূরে। কতটা দূরে সে আর এখন ধারণা করতে পারিনা। কিন্তু, ঝাপসা হয়ে আসা স্মৃতির আড়ালে এইটা আজো মনে পড়ে যে, দূরত্বটা নিছক ভৌগোলিকই ছিল না, কি কথার ধরণে, কি খাদ্যাভ্যাসে, কি পারস্পরিক আলাপচারিতায় সে দূরত্ব ছিল জীবনযাত্রারও, জীবন বোধের ও হয়ত বা!

তাহাদের সেই গ্রামের নামটি ঘর্ঘরিয়া। গ্রামটি ছিল নদীর পাড়ে, তাহাদের সেই নদীর নামটি, সেটিও ছিল ঘর্ঘরিয়া।

এ লেখা এই পর্যন্ত লিখে ভাবলাম, স্মৃতি ঠিকমত সাথ দিচ্ছে ত? দূরভাষে মা’কে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইলাম যে সেই বেড়াতে যাওয়া নিয়ে তাঁর কিছু মনে পড়ে কি না। মা এখন শরীরে প্রচুর-ই অশক্ত। কিন্তু স্মৃতি আর মনন তাঁর, আজও বিপুল ভাবে সতেজ সচলতার হকদার। জিজ্ঞাসামাত্রই স্রোতের মত প্রবাহিত হ’ল নানা পারিবারিক তথ্য। সেই স্রোতের ধাক্কা সামলে ভৌগোলিক তথ্যটি বার করতে গিয়েই গোল বেঁধে গেল। মা বললে নদীর নাম ঘর্ঘরিয়া নয়, তোর্সা। এখন কি করি আমি! শরণ নিলাম অগতির গতি গুগল-এর। মাস খানেক কি তার ও বেশী সময় ধরে ঘুরে বেড়ালাম এ লেখা থেকে ও লেখায়, মানচিত্রের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। যা জানলাম তা বেশ মজার। দূর উত্তরে সেই সোনাপুর, কামসিংগ্রাম এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করে ঘর্ঘরিয়া নামের নদীটি যখন দক্ষিণে তোর্সায় এসে মিলেছে তখন শেষের দিকের খানিকটা জুড়ে সে ও এক তোর্সা নাম নিয়েছে, শীল তোর্সা। একটি জায়গায় প্রায় তিন-চতুর্থ বৃত্তাকারে নদীটি যে ভূমিখন্ডকে ঘিরেছে তার উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে নদীটির নাম ঘর্ঘরিয়া আর উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ প্রান্ত জুড়ে নদীটির নাম শীল তোর্সা। এই এলাকাতেই কি তা হলে ছিল নদীর নামে সেই গ্রাম? গুগল দিয়ে খোঁজ করলে কি সব ঘর্ঘরিয়া প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় খন্ড-র কথা জানায়। মৌজা বোধ হয় তারা। এমন তা হ’লে হতে পারে, ঘর্ঘরিয়া নামের বিস্তৃত এক এলাকার মধ্য ছিল অনেক গ্রাম। তারই কোন একটায় গিয়েছিলাম আমরা। হায়, আজ আর আমার কোন উপায় নাই জানার!

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে ঘুরে যাই। এই খোঁজাখুঁজির কালে দুটি নাম চোখে পড়ল। ঘর্ঘরিয়া নদী আর ৩১ নং জাতীয় সড়কের মাঝখানের জমিতে একটি ধনুকাকৃতি দীর্ঘ জলাশয় । নাম তার – শোল মাছের বিল! আর তার পশ্চিম প্রান্তে সামান্য তফাতে একটি বিশাল চৌকো দিঘী। তার নাম? লাল পরীর দিঘী! আহা! কি রোমাঞ্চকর নাম! কিন্তু, কেন এই নামগুলি, কি রহস্য ধরা আছে এখানে? জানি না। গুগল করে কিছুই পাওয়া গেল না। কত যে গল্প চাপা পড়ে থাকে, হারিয়ে যায়, যাচ্ছে! সময় থাকতে লিখে না রাখলে সব স্মৃতিই মিলায় বিস্মৃতিতে!

ঘর্ঘরিয়া গ্রামের স্মৃতি আমার তিনটি। প্রথমটির কথা অবশ্য বলতে ইচ্ছে করে না। আজ আশা করি সকলই অন্যরকম, কিন্তু সেই দিনগুলোতে আমাদের সেই আত্মীয় বাড়িতে কোন ভদ্রদস্তুর শৌচাগার ছিল না। আমাদের ছোটদের জন্য ত নদীর ধার কি মাঠের কোণ ছাড়া অন্য কোন ব্যবস্থাই ছিল না। আজীবন খুঁতখুঁতে মানুষ আমি। ঐ দুটি দিন যে কি ভাবে এ ব্যাপারটা কাটিয়েছিলাম সে ভাবলে আজো সিঁটিয়ে যাই। তবে, সেই যন্ত্রণাকে লঘু করে দিয়েছিল এক মধুর অভিজ্ঞতা। সেই দ্বিতীয় স্মৃতিটি এই বুড়ো বয়সেও অ্যাডভেঞ্চার-এর অনুভূতি ফিরিয়ে আনে। প্রথম দিনের শেষে সম বয়সী যাদের সাথে দোস্তি জমে গিয়েছিল, তাদের থেকে এক বালিকা দ্বিতীয় দিনের সকালে আমায় নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিল, তাদের জল-জঙ্গল-মাঠ-ঘাট দেখাতে। সারা দিন ঘুরেছিলাম তার সাথে। সে আমায় দেখাল নদী, দেখাল মাঠ, বাগান, গাছ – ফলের, ফুলের! কত যে রকমের গাছ! আর কত যে রকমের ফুল! এবং, ফুলের মধু! তার কাছেই শিখলাম ফুলের গোড়াটা খুলে ফেলে কিভাবে সেখান থেকে মধু চুষে খেতে হয়। সারা সকাল ঘুরে ঘুরে মধু খেয়ে বেড়ালাম দু’জনে, জানা, না-জানা কত যে ফুলের! ভিন্নতর মধুর সন্ধান পাওয়ার আগে সেই আমার পরম মধুর প্রাপ্তি।

তৃতীয় স্মৃতিটি একটি অনুষ্ঠান-এর। বিয়ে উপলক্ষে কীর্তনের আয়োজন হয়েছিল। চারদিক খোলা গোল তাঁবুর মত ম্যারাপ। মাঝখানে গোল চঁদোয়া। তার নীচে, কেন্দ্রের খুঁটিটি ঘিরে নানা ফটো, বৈষ্ণব ধর্মের নানা দিকপালদের। তাদের ঘিরে খোল-কর্তাল ইত্যাদি বাজিয়ে জোর কীর্তন গান হচ্ছে। বেশ ভীড়। ঠাকুমার হাত ধরে আমি সামনের দিকেই বসে পড়লাম। একটু পরে দেখি অবাক কান্ড, ঠাকুমার চোখ দিয়ে জলের ধারা বইছে! আমার রীতিমত ডাকাবুকো ঠাকুমাকে সে দিনের আগে কখনো আমি কাঁদতে দেখিনি। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি, আরো আশ্চর্য! বয়স্ক মানুষেরা ধূলায় গড়াগড়ি দিয়ে কান্নাকাটি করছে। সেদিনই প্রথম দেখেছিলাম ব্যক্তি মানুষের চিন্তা-চেতনা-কাজ-এর উপর সম্মিলিত মানুষের আচরণের প্রভাব। বেলা হয়ে যাওয়ার কারণে যখন আসর ছেড়ে চলে এসেছিলাম ততক্ষণে গোটা আসরটি পরিণত হয়েছিলা একটি একীভূত চেতনা-আধারে। গোটা আসর একসাথে দুলছে, গাইছে, কাঁদছে, গড়াগড়ি দিচ্ছে, উঠে দাঁড়াচ্ছে, আকুতি জানাচ্ছে, আনন্দ প্রকাশ করছে। কথক মানুষটি কখন যে সেই জনতাকে উদ্বেলিত করছে আর কখন যে নিজেই উদ্বেলিত জনতার মিলিত অভিঘাতে ভেসে যাচ্ছে সেটা আর আলাদা করে ধরতে পারছিলাম না। ধরা সম্ভব-ও ছিল না, নিতান্তই ছেলেমানুষ আমার পক্ষে। আজও কি পারি!

কুচবিহারেই প্রথম যাত্রা দেখেছিলাম। খুবই সাধারণ মাপের, পরবর্ত্তীতে যে বিপুল জনপ্রিয়তার বিরাট আয়োজনগুলি দেখেছি তার ধারে কাছেও নয়। মুগ্ধও হই নি তেমন করে। তবুও যে সে রাতের কথা মনে আছে তার কারণ, যাত্রার পরের একটি ঘন্টা। যাত্রার শেষের দিকেই আকাশে বাতাসে টের পাওয়া যাচ্ছিল ঝড়ের সংকেত। কিন্তু গল্প ছেড়ে কার আর উঠতে মন চায়! ফলে লোকেরা যখন একসাথে ঘরমুখী হ’ল, কয়েক পা যেতে না যেতেই ঝড়-জল আছড়ে পড়ল প্রবল মত্ততায়। এগোতে পারছি না। মাথার উপর ঠাস ঠাস করে আছড়ে পড়ছিল বরফের গুলি। আমরা বড়-মেজ দুই ভাই, বাবা আর ঠাকুমা – চারজনের দল। ঠাকুমার হাত ধরে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম বাবার হাত ধরা মেজ ভাইয়ের থেকে। আমরা দু’জন কোন একটা বাড়ির সামনের তিনদিক খোলা, ছাদঢাকা বারান্দায় আশ্রয় নিলাম। ঝড় একটু কমার পর দু’জনে বাড়ি ফিরে দেখি মা জানলা ধরে দাঁড়িয়ে কেঁদে যাচ্ছে নিঃশব্দে। বাবা আর মেজ ভাই সোজা বাড়ি চলে এসেছিল। আমাদের না দেখে বাবা বেড়িয়ে পড়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। মিশমিশে কালো রাতে প্রকৃতির ঐ প্রবল তান্ডবের মধ্যে সে লোক ঘুরে বেড়িয়েছে তার ছেলে আর মা-এর খোঁজে। ঝড় পুরোপুরি থামার পরেও কোথাও আমাদের না পেয়ে ফিরে এল নিদারুণ হতাশায় বিপর্যস্ত, বিদ্ধস্ত হয়ে। বাড়িতে এসে দেখে হারানিধিরা ঘরেই হাজির, সুস্থ অবস্থায়। গম্ভীর মানুষটি তখন যে বিরাট আনন্দের ঢেউয়ে উচ্ছসিত হয়ে উঠেছিল তার গভীরতা আমি সে’দিন বুঝি নি। বুঝেছি অনেক প’রে, বিনা সংবাদে, সময়ের মাপহীন সময় যেদিন পার করতে হয়েছিল নিজের সন্তান-এর ঘরে ফেরার অপেক্ষায়, সেই দিন!

আগের পর্ব পরের পর্ব